সরকারি কাজে এআই ব্যবহার কি গোপন তথ্য ফাঁসের ঝুঁকি তৈরি করছে

এআইফাইল ছবি: রয়টার্স

দাপ্তরিক চিঠির খসড়া, দীর্ঘ প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ তৈরি বা তথ্য বিশ্লেষণের মতো কাজে সরকারি কর্মকর্তারা দিন দিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই টুলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছেন। কিন্তু এসব তথ্যের একটি বড় অংশ যদি হয় রাষ্ট্রের গোপন নথিপত্র, নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত বা নাগরিকদের ব্যক্তিগত উপাত্ত; তবে তা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে এআই ব্যবহারে সরকারি কর্মকর্তাদের সতর্ক করে নতুন নির্দেশিকা জারি করেছে প্রশাসন।

সরকারি কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) টুল ব্যবহারে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও দায়িত্বশীলতা অবলম্বনের নির্দেশনা রয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের। একই সঙ্গে সরকারি সংবেদনশীল ও গোপনীয় তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রচলিত আইন, বিধি-বিধান ও সরকারি নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণের আহ্বান জানানো হয়েছে বেশ আগেই। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ই-গভর্ন্যান্স-২ শাখা থেকে গত ২৮ জুলাই জারি করা এ-সংক্রান্ত একটি চিঠি সব সিনিয়র সচিব ও সচিবের কাছে পাঠানো হয়।

চিঠিতে বলা হয়েছে, বর্তমানে সরকারি দপ্তরগুলোর বিভিন্ন কার্যক্রমে এআই টুলের ব্যবহার ক্রমে বাড়ছে। এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে কাজের গতি, দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়লেও অসতর্ক ব্যবহারে সরকারি সংবেদনশীল ও গোপনীয় তথ্য অননুমোদিতভাবে প্রকাশ বা তৃতীয় পক্ষের কাছে চলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে সরকারি দাপ্তরিক কাজে এআই টুল ব্যবহারের সময় সরকারি তথ্যের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন, বিধি-বিধান এবং সরকারের জারি করা নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে, যাতে প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি সরকারি তথ্যের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা অক্ষুণ্ন থাকে।

চ্যাটজিপিটি, ক্লড, জেমিনি কিংবা ডেটা বিশ্লেষণের জন্য উন্মুক্ত এআই টুল মূলত লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল দিয়ে পরিচালিত হয়। এসব পাবলিক টুলে যখন কোনো ব্যবহারকারী তথ্য জমা দেন, তখন সেই তথ্যগুলো এআই মডেলের অ্যালগরিদমকে আরও প্রশিক্ষিত করার জন্য তাদের কেন্দ্রীয় সার্ভারে সংরক্ষিত হয়। কোনো কর্মকর্তা যদি দাপ্তরিক গোপনীয় খসড়া নীতি, রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, গোয়েন্দা তথ্য বা নাগরিকদের ব্যক্তিগত সংবেদনশীল তথ্য এসব এআই টুলে আপলোড করেন, তবে তা সরাসরি তৃতীয় পক্ষের ক্লাউড সার্ভারে চলে যায়। পরবর্তী সময়ে অন্য কোনো ব্যবহারকারীর অনুসন্ধানের জবাবে বা সার্ভার হ্যাক হলে, সেসব তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ার শতভাগ ঝুঁকি রয়েছে।

প্রযুক্তি–বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্মুক্ত এআই টুলগুলোর তথ্যের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। ফলে অননুমোদিত এআই টুলে অফিশিয়াল তথ্য দেওয়া মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।

টেলিযোগাযোগ, অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় মানবিক রাষ্ট্র বইয়ের লেখক রকিবুল হাসান প্রথম আলোকে জানান, রাষ্ট্রীয় সব ডেটা স্পর্শকাতর নয়। সরকারের হাতে এমন অনেক তথ্য থাকে, যেগুলো উন্মুক্ত করে দিলে ক্ষতি নেই; বরং লাভ আছে। বেসরকারি খাত সেই তথ্য কাজে লাগিয়ে জনগণের জন্য নতুন নতুন সেবা দিতে পারে। এতে বেসরকারি খাত গতিশীল হয়। আজকের গুগল ম্যাপ সহায়তা পেয়েছে মার্কিন সরকারের ওপেন ডেটা পলিসি থেকে। গুগল ম্যাপ তৈরির আগেই সরকারি খরচে বিশাল ডেটাসেট তৈরি হয়েছিল। গুগল সেটা কাজে লাগিয়েছে। জিপিএসের গল্পটাও একই রকম।

ইউএস এয়ারফোর্স যে জিপিএস প্রযুক্তি ব্যবহার করত, সেটিও ওপেন ডেটা পলিসির সুবাদে সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছেছে। আজ আমরা সবাই ফোনে জিপিএস ব্যবহার করি, কারণ ওপেন ডেটা পলিসি। এবার বলা যাক এআইয়ের প্রসঙ্গে। সরকারি ওয়েবসাইট বা ওপেন ডেটা প্ল্যাটফর্মে যেসব ডেটা পাবলিকলি রাখা আছে, সেগুলো ফ্রন্টিয়ার এআই মডেলে ব্যবহার করলে সমস্যা কম। কারণ, এসব তথ্য এমনিতেই পাবলিক ডোমেইনে পাওয়া যায়; কিন্তু সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন সংবেদনশীল আর গোপনীয় তথ্যের প্রসঙ্গ আসে। সরকারি সংজ্ঞা অনুযায়ী, এ ধরনের তথ্য দেশের বাইরের কোনো এআই প্ল্যাটফর্মে পাঠানো যাবে না। এ কারণেই এখন পৃথিবীজুড়ে সোভারেন এআই বা সার্বভৌম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। এটি মূলত নিজের দেশের সীমানার ভেতর, নিজের নিয়ন্ত্রণে চলা এআই সিস্টেম।

সরকারি দপ্তরের বাইরেও এই চিন্তা ছড়িয়ে পড়ছে। অনেক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, অনেক ওষুধ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান নিজেদের ডেটা সেন্টারে নিজস্ব এআই প্ল্যাটফর্ম বানাচ্ছে। কারণ, তাদের ডেটাও একইভাবে সংবেদনশীল। এখানে সরকারের একটা সুযোগ আছে। প্রাইভেট সেক্টরের যেসব ডেটা সেন্টার এমনিতেই আছে, সেগুলোকে সোভারেন এআই নীতিমালার আওতায় প্রণোদনা দেওয়া যায়। যাতে তারা নিজেরাই এআই প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলে। এতে সরকারের লাভ কী?

সরকারকে নিজে বিশাল অঙ্কের টাকা ঢেলে ডেটা সেন্টার বানাতে হবে না; বরং বেসরকারী খাতের কাছ থেকে শুধু সেবা কিনলেই চলবে। খরচও কমবে, দক্ষতাও বাড়বে। তথ্য লুকিয়ে রাখার বিষয় নয়। তবে কোন কোন তথ্য খোলা রাখলে দেশের লাভ হবে; আর কোনটা বন্ধ রাখা জরুরি, তা নির্বাচন করাই আসল কাজ। যেসব রাষ্ট্র এই নির্বাচন দ্রুত ঠিকমতো করতে পারবে, তারাই এগিয়ে থাকবে।