ফ্রিজের আকারে কৃত্রিম উপগ্রহে মহাকাশে গুগলের এআই চিপ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির চিপ এবার প্রথমবারের মতো মহাকাশে পাঠিয়েছে গুগল। গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার ভ্যানডেনবার্গ থেকে স্পেসএক্সের ফ্যালকন ৯ রকেটে উৎক্ষেপণ করা হয় ফ্রিজের আকারের একটি পরীক্ষামূলক কৃত্রিম উপগ্রহ। এতে গুগলের চারটি টেনসর প্রসেসিং ইউনিট (টিপিইউ) চিপ রয়েছে। মহাকাশে এআই ডেটা সেন্টার পরিচালনা করা সম্ভব কি না, তা যাচাইয়ের দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ ‘প্রজেক্ট সানক্যাচার’–এর প্রথম পরীক্ষা এটি।
প্ল্যানেট ল্যাবসের সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি করা উপগ্রহটি স্পেসএক্সের ট্রান্সপোর্টার–১৮ অভিযানের অংশ হিসেবে মহাকাশে পাঠানো হয়। ওই অভিযানে আরও ১০০টির বেশি সরঞ্জাম ও যন্ত্র বহন করা হয়েছে। প্রজেক্ট সানক্যাচারের প্রধান ট্রাভিস বিলস পরে জানান, তাঁরা উপগ্রহটির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পেরেছেন এবং এটি প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করছে। উপগ্রহটির কার্যক্রম পুরোপুরি শুরু হলে এতে থাকা টিপিইউ চিপ দিয়ে গুগলের উন্মুক্ত ওজনের (ওপেন–ওয়েট) এআই মডেল জেমার একটি সংস্করণ চালানো হবে। তবে প্রতিবার মাত্র ১৫ মিনিট ধরে এই পরীক্ষা চালানো যাবে। কারণ, মহাকাশে তাপ নিয়ন্ত্রণ ও বিদ্যুৎ সরবরাহের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। গুগলের লক্ষ্য, এক বছর ধরে উপগ্রহটির কার্যক্রম চালু রাখা।
এই অর্জন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোস্ট করেছেন গুগলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সুন্দর পিচাই। তিনি লিখেছেন, ‘মহাকাশে কম্পিউটিং ব্যবস্থা স্থাপনের ধারণাটি নিয়ে দলের প্রথম বৈঠকের কথা আমার মনে আছে। এটি ছিল দারুণ একটি ধারণা!’ সফল উৎক্ষেপণের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, প্ল্যানেটের সঙ্গে এই সাফল্য তাঁদের অগ্রগতির পাশাপাশি সামনে আরও কতটা পথ পাড়ি দিতে হবে, তা তুলে ধরেছে। উৎক্ষেপণে সহায়তার জন্য স্পেসএক্সকেও ধন্যবাদ জানান তিনি। পাশাপাশি স্পেসএক্সের বুস্টার রকেটের আরেকটি সফল অবতরণের প্রশংসা করেন।
এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য বিদ্যুৎ সরবরাহের সমস্যা সমাধান করা। গুগলের ধারণা, পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে স্থাপিত সৌর প্যানেল ভূপৃষ্ঠের তুলনায় আট গুণ পর্যন্ত বেশি শক্তি উৎপাদন করতে পারে। পরীক্ষামূলক উপগ্রহটি এমন একটি সূর্য–সমলয় কক্ষপথে থাকবে, যেখানে এর সৌর প্যানেল প্রায় কখনোই ছায়ায় পড়বে না। ফলে বিদ্যুৎ সংরক্ষণের জন্য ভারী ব্যাটারির প্রয়োজন হবে না। এআই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডেটা সেন্টারগুলোর বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়ছে। অন্যদিকে পৃথিবীতে নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধিতাও বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে মহাকাশে ডেটা সেন্টার স্থাপনের ধারণাটি গুরুত্ব পাচ্ছে।
এ ক্ষেত্রে গুগলই একমাত্র প্রতিষ্ঠান নয়। স্টারক্লাউড নামের একটি স্টার্টআপ গত বছরের নভেম্বরে এনভিডিয়ার এইচ১০০ চিপ মহাকাশে পাঠিয়েছে। স্পেসএক্সও নিজস্ব কক্ষপথভিত্তিক কম্পিউটিং উপগ্রহ তৈরির কাজ করছে। তবে গুগলের পরিকল্পনা আরও বড় পরিসরের। প্রতিষ্ঠানটি এমন উপগ্রহগুচ্ছ তৈরির কথা ভাবছে, যেখানে ৮১টি উপগ্রহ কাছাকাছি অবস্থানে থেকে একই সঙ্গে কাজ করবে। প্রতিটি উপগ্রহে থাকবে কয়েক ডজন টিপিইউ চিপ। উপগ্রহগুলো পরস্পরের সঙ্গে লেজার প্রযুক্তির মাধ্যমে তথ্য আদান–প্রদান করবে। ২০২৭ সালে দুটি উপগ্রহের মাধ্যমে এই লেজার যোগাযোগব্যবস্থা পরীক্ষা করার পরিকল্পনা রয়েছে।
মহাকাশে পাঠানোর আগে গুগল তাদের ট্রিলিয়াম টিপিইউ চিপে বিকিরণ সহ্য করার পরীক্ষা চালায়। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভিস ক্যাম্পাসের ক্রোকার নিউক্লিয়ার ল্যাবরেটরিতে প্রোটন রশ্মি ব্যবহার করে এই পরীক্ষা করা হয়। এতে চিপগুলো পাঁচ বছরের একটি মহাকাশ অভিযানে যতটা বিকিরণের মুখোমুখি হতে পারে, তার চেয়ে বেশি মাত্রার বিকিরণ সহ্য করতে পেরেছে। তবে পরীক্ষার ব্যবস্থায় একটি সমস্যা ধরা পড়ে। গুগল দেখতে পায়, পরীক্ষাগারে ব্যবহৃত ব্যবস্থাটি চিপগুলোকে মহাকাশের তুলনায় বেশি সুরক্ষা দিচ্ছিল। ফলে নতুন করে পরীক্ষা চালাতে হয়। দ্বিতীয় পরীক্ষায় চিপে কিছুটা বেশি যৌক্তিক ত্রুটি দেখা যায়। বিলসের হিসাব অনুযায়ী, সাধারণভাবে এআই মডেলের মাধ্যমে প্রশ্নের উত্তর তৈরির মতো কাজে প্রতি ১০ লাখ কার্যক্রমে প্রায় একটিতে এ ধরনের ত্রুটি দেখা দিতে পারে। সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ক্ষেত্রে এই হার গ্রহণযোগ্য হতে পারে। কিন্তু হাজার হাজার চিপ ব্যবহার করে টানা কয়েক মাস ধরে এআই মডেল প্রশিক্ষণের সময় এমন ত্রুটি বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে। মহাকাশে পৌঁছানোর সময়ও চিপগুলোকে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়। পৃথিবীর কক্ষপথে পৌঁছাতে প্রায় ১০ মিনিট লাগে। এ সময় চিপগুলোকে অভিকর্ষজ ত্বরণের ৫০ থেকে ১০০ গুণ পর্যন্ত বল সহ্য করতে হতে পারে। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তাপ নিয়ন্ত্রণ। মহাকাশে বাতাস না থাকায় প্রচলিত পদ্ধতিতে তাপ সরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। তাপ বের করে দেওয়ার জন্য প্রয়োজন বিশেষ রেডিয়েটর। গুগল এ কাজে হিট পাইপ ও রেডিয়েটর ব্যবহার করছে। কিন্তু রেডিয়েটরগুলো উপগ্রহের সবচেয়ে ভারী অংশগুলোর মধ্যে অন্যতম। ফলে উপগ্রহ উৎক্ষেপণের খরচও বেড়ে যায়।
গুগলের প্রজেক্ট সানক্যাচারের প্রধান ট্রাভিস বিলস মনে করেন, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে মহাকাশে কম্পিউটিংয়ের ব্যবস্থা পরিচালনার খরচ পৃথিবীর ডেটা সেন্টারের তুলনায় কম হবে না। তাঁর ভাষায়, ‘আমার মনে হয়, এর চেয়ে বেশি সময় লাগবে।’ জুল সাময়িকীতে প্রকাশের জন্য প্রস্তুত গুগলের একটি গবেষণাপত্রেও এ বিষয়ে ধারণা দেওয়া হয়েছে। গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রতি কেজি মালামাল মহাকাশে পাঠানোর খরচ কমে প্রায় ২০০ ডলারে নেমে আসতে পারে। ভারতীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ১৭ হাজার ৭০০ রুপি। এই লক্ষ্যে পৌঁছাতে স্পেসএক্সের স্টারশিপ রকেটকে এক দশকে প্রায় ১ হাজার ৮০০ বার উৎক্ষেপণ করতে হবে। প্রতিবার রকেটটিতে ২০০ টন করে মালামাল বহন করতে হবে। তবে এখন পর্যন্ত স্টারশিপ এক বছরে পাঁচবারের বেশি উৎক্ষেপণ করা হয়নি। পৃথিবীকে প্রদক্ষিণরত গুগলের চারটি টিপিইউ চিপের পরীক্ষার লক্ষ্য আপাতত সীমিত। মহাকাশের প্রতিকূল পরিবেশে চিপগুলো টিকে থাকতে পারে কি না, তা প্রমাণ করা।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া