গ্রামের মানুষের জন্য তৈরি করা বাংলাদেশের ভুয়া সংবাদ নেটওয়ার্ক স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করেছে ক্লড
ক্লড বহুল ব্যবহৃত একটি এআই টুল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের মালিকানায় রয়েছে ক্লড। অ্যানথ্রপিক তাদের সর্বশেষ ডিটেক্টিং অ্যান্ড কাউন্টারিং মিসইউজ অব এআই প্রতিবেদনে সাইবার নিরাপত্তা ও ক্ষতিকর অপব্যবহার রোধের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছে। চলতি সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বৈশ্বিক সাইবার অপারেশনের পাশাপাশি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে প্রভাবিত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহারের একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা ১০ সেপ্টেম্বর প্রকাশ করা হয়েছে।
একই প্রতিবেদনে রাশিয়ার গুপ্তচরবৃত্তি, ইউরোপের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে আক্রমণ, ক্লডের মাধ্যমে ইরানের ব্যবহারকারীদের ওপর নজরদারি, সিরিয়াসহ তিব্বত ও তাইওয়ানে চীনের নজরদারিসহ নানা ঘটনা তুলে ধরেছে প্রতিষ্ঠানটি। বাংলাদেশ–সংক্রান্ত একটি ঘটনা প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে জানানো হয়, অ্যানথ্রপিকের থ্রেট ইন্টেলিজেন্স টিম এমন একটি সুসংগঠিত ও স্বয়ংক্রিয় অপপ্রচার নেটওয়ার্ক শনাক্ত করেছে, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্ল্যাটফর্ম ক্লড ব্যবহার করে বাংলায় ভুয়া সংবাদ তৈরি করত। বাংলাদেশের গাইবান্ধা জেলার এক ব্যক্তি বা অ্যাক্টর (রিপোর্টে ব্যবহারকারীকে অ্যাক্টর হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে) এই কার্যক্রম পরিচালনা করেন। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ–অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতার বাইরে থাকা রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) পক্ষে জনমত তৈরি ও তাদের প্রতিপক্ষদের হেয়প্রতিপন্ন করাই ছিল এই নেটওয়ার্কের মূল উদ্দেশ্য।
ক্লড প্ল্যাটফর্মের নিয়ম ও শনাক্তকরণ এড়াতে ওই ব্যক্তি মোট ২৯টি ভিন্ন অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেন। একটি সফটওয়্যার প্রোগ্রাম তৈরি করে অভিযুক্ত ব্যক্তি সরাসরি ক্লডের এপিআইয়ের সঙ্গে যুক্ত হন। প্রোগ্রামটি নির্দিষ্ট ব্যাচে বা ফ্রেমে কাজ করত। প্রতিবার এটি ১৫টি ভুয়া শিরোনাম, ৩টি বিস্তারিত মিথ্যা সংবাদ ও ১৫টি ইংরেজি ছবি তৈরির প্রম্পট বানাত। ক্লডের নিজস্ব ছবি তৈরির ফিচার না থাকায় এসব প্রম্পট অন্য এআই মডেলে ব্যবহার করে ভুয়া সংবাদের জন্য ছবি বা ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট তৈরি করা হতো।
অ্যানথ্রপিকের তদন্তে দেখা যায়, গ্রামীণ এলাকার স্বল্পশিক্ষিত লোকজনকে লক্ষ্য করে এই আধেয় বা কনটেন্টগুলো তৈরি করা হয়। ফেসবুক লাইভ, ইউটিউব ও টিকটক লাইভ স্ট্রিমের মাধ্যমে এই ভুয়া তথ্যগুলো ছড়িয়ে দেওয়া হতো। অপপ্রচারের মূল লক্ষ্যবস্তু ছিল বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। এ ছাড়া ধর্মীয় উগ্রবাদ ছড়ানোর মিথ্যা অভিযোগ, সাজানো গুপ্তহত্যা ও বিরোধীদের বিদেশি চর হিসেবে চিহ্নিত করে ভুয়া বিবরণী প্রচার করা হতো।
অ্যানথ্রপিক তাদের তদন্তে স্পষ্ট জানিয়েছে, এই নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ বা বিদেশ থেকে এককভাবে পরিচালিত হলেও এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক দলের সরাসরি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নির্দেশনা বা অর্থায়নের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে এর বিষয়বস্তু ভূরাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে মিলে গেলেও এর পেছনে কোনো রাষ্ট্রীয় মদদ ছিল না। ইউটিউবের এপিআই ব্যবহার করে একটি আলাদা স্ক্রিপ্টের মাধ্যমে ভিডিওগুলো এক মাস আগেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপলোড করার শিডিউল করা থাকত।
অ্যানথ্রপিক এই কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত সব অ্যাকাউন্ট চিরতরে নিষিদ্ধ করেছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের অপব্যবহার রোধ করতে তারা তাদের এআই মডেলের সুরক্ষাব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করেছে। একই সঙ্গে অন্য প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে এই তথ্যগুলো শেয়ার করা হয়েছে, যাতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের ভুয়া তথ্যের বিস্তার রোধ করা সম্ভব হয়।
সূত্র: অ্যানথ্রপিক