এআই চিপের চাহিদায় বাড়ছে বৈশ্বিক চাপ, চরম সংকটের আশঙ্কা ইলন মাস্ক ও টিম কুকের

চিপের চাহিদা বাড়ায় চিন্তিত বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোছবি: জেমিনাই/এআই

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার বিশ্ব প্রযুক্তি খাতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। একই সঙ্গে তৈরি হয়েছে নতুন উদ্বেগও। এআইনির্ভর ডেটা সেন্টার স্থাপনে বিপুল বিনিয়োগের ফলে বিশ্বজুড়ে মেমোরি চিপের চাহিদা অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। এতে সরবরাহব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে এবং দীর্ঘমেয়াদি সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এই পরিপ্রেক্ষিতে সতর্কবার্তা দিয়েছেন টেসলার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইলন মাস্ক ও অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা টিম কুক। তাঁদের মতে, এআই অবকাঠামো গড়ে তুলতে যে পরিমাণ উন্নত মেমোরি চিপ প্রয়োজন হচ্ছে, তা বর্তমান উৎপাদন সক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি। ফলে বাজারে সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। সংকটের প্রভাব ইতিমধ্যে ব্যবসায়িক ফলাফলেও পড়তে শুরু করেছে। বিশ্বের বৃহত্তম পারসোনাল কম্পিউটার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান লেনোভো জানিয়েছে, তাদের মুনাফা ২১ শতাংশ কমেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ডায়নামিক র‍্যানডম অ্যাকসেস মেমোরি বা ডির‍্যাম চিপের মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহে অনিশ্চয়তা এই পতনের অন্যতম কারণ। গত কয়েক মাসে বড় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। ডির‍্যাম চিপ স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, সার্ভারসহ প্রায় সব আধুনিক প্রযুক্তিপণ্যের অপরিহার্য উপাদান। কিন্তু চাহিদা দ্রুত বাড়লেও উৎপাদন সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।

টিম কুক জানিয়েছেন, বৈশ্বিক এই চিপ–সংকট আইফোনের মুনাফার মার্জিনে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে ইলন মাস্ক বলেছেন, সরবরাহনির্ভরতা কমাতে প্রয়োজনে টেসলাকে নিজস্ব সেমিকন্ডাক্টর কারখানা গড়ে তুলতে হবে। সাম্প্রতিক এক আয়সংক্রান্ত আলোচনায় তিনি জানান, ‘টেরাফ্যাব’ নামে একটি বৃহৎ কারখানা নির্মাণের পরিকল্পনা বিবেচনায় রয়েছে, যাতে আগামী তিন থেকে চার বছরের সম্ভাব্য সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠা যায়।

মাস্কের অভিযোগ, টিএসএমসি, স্যামসাং ও মাইক্রোন টেকনোলজিসহ বড় নির্মাতারা টেসলার প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত চিপ সরবরাহ করতে পারছে না। তিনি মনে করেন, সামনে দুটি পথ। চিপের দেয়ালে আটকে যাওয়া অথবা নিজেরাই কারখানা নির্মাণ করা। বিশ্লেষকদের মতে, এ সংকটের অন্যতম কারণ এআই ডেটা সেন্টারের দ্রুত সম্প্রসারণ। গুগল ও ওপেনএআইয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের এআই সেবা পরিচালনায় বিপুল পরিমাণ মেমোরি চিপের অর্ডার দিয়েছে। এর ফলে সাধারণ ভোক্তাপণ্যের জন্য সরবরাহ কমে গেছে। বাজার গবেষণা সংস্থা ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারির মধ্যে একধরনের ডির‍্যাম চিপের দাম ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এআই ডেটা সেন্টারের নির্মাণকাজ পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই বাজারে সরবরাহ–সংকট স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতির প্রভাব পড়ছে পণ্যমূল্যেও। পিসি, স্মার্টফোন ও ল্যাপটপের দাম গত কয়েক মাসে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোও গ্রাহকদের সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে সতর্ক করছে। ডেল, স্যামসাং ও শাওমি ইতিমধ্যে জানিয়েছে, চলতি বছরে তাদের পণ্যের দাম বাড়তে পারে। বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা, শিগগিরই স্মার্টফোন তৈরির মোট উপাদান ব্যয়ের প্রায় ৩০ শতাংশই ডির‍্যাম বা র‍্যাম–সংক্রান্ত খাতে ব্যয় হতে পারে।

চিপ–সংকটের প্রভাব গেমিং শিল্পেও পড়তে পারে। জাপানের প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান সনি প্লেস্টেশন ৬ উন্মোচনের সময় ২০২৮ বা ২০২৯ সাল পর্যন্ত পিছিয়ে দিতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে। একইভাবে নিনটেন্ডোর নতুন হ্যান্ডহেল্ড কনসোল ‘সুইচ ২’–এর দামও বাড়তে পারে।

সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস