বিচ্ছেদের কষ্ট ভুলতে সাবেক প্রেমিক-প্রেমিকার নামে এআই চ্যাটবট তৈরি করে গল্প
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি এখন শুধু তথ্য খোঁজা, ছবি তৈরি বা কাজের সহকারী হিসেবেই সীমাবদ্ধ নেই। ধীরে ধীরে মানুষের ব্যক্তিগত আবেগ, সম্পর্ক ও মানসিক নির্ভরতাতেও প্রবেশ করছে প্রযুক্তিটি। কেউ এআই চ্যাটবটের সঙ্গে আবেগগত সম্পর্ক গড়ে তুলছেন, কেউ আবার মনোরোগবিশেষজ্ঞ বা থেরাপিস্টের বিকল্প হিসেবেও ব্যবহার করছেন এআই। তবে সম্প্রতি সামনে এসেছে আরও জটিল ও বিতর্কিত এক প্রবণতা। বিচ্ছেদের কষ্ট কাটিয়ে উঠতে সাবেক প্রেমিক বা প্রেমিকার এআই চ্যাটবট তৈরি করে সেই ডিজিটাল প্রতিরূপের সঙ্গে নিয়মিত গল্প করছেন অনেক।
দক্ষিণ চায়না মর্নিং পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিচ্ছেদের পর অনেকেই তাঁদের সাবেক সঙ্গীর পুরোনো চ্যাট, ছবি, কণ্ঠ রেকর্ড এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য বিভিন্ন এআই টুলে যুক্ত করে তৈরি করছেন ভার্চ্যুয়াল সংস্করণ। এরপর সেই এআই সংস্করণের সঙ্গে নিয়মিত কথোপকথনও চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা। ব্যবহারকারীদের দাবি, এতে বিচ্ছেদের মানসিক চাপ কিছুটা কমে এবং না-বলা অনুভূতিগুলো প্রকাশের সুযোগ তৈরি হয়। তবে বিষয়টি ঘিরে নতুন বিতর্কও শুরু হয়েছে। প্রযুক্তি–বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এ ধরনের প্রযুক্তি একদিকে যেমন সাময়িক মানসিক সান্ত্বনা দিতে পারে, অন্যদিকে তা মানুষকে বাস্তবতা থেকে দূরে সরিয়ে দীর্ঘমেয়াদি আবেগগত নির্ভরতার দিকেও ঠেলে দিতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ ধরনের ব্যবহার প্রথমে দেখা যায় ‘কলিগ ডট স্কিল’ নামের একটি উন্মুক্ত এআই প্ল্যাটফর্মে। মূলত কর্মক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তির জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও যোগাযোগের ধরন সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে প্ল্যাটফর্মটি তৈরি করা হয়েছিল। ধারণাটি ছিল এমন, কোনো কর্মী অনুপস্থিত থাকলেও তাঁর ডিজিটাল সংস্করণের মাধ্যমে সহকর্মীরা প্রয়োজনীয় তথ্য বা পরামর্শ নিতে পারবেন।
কিন্তু প্রযুক্তিটি খুব দ্রুতই ভিন্ন বাস্তবতায় ব্যবহৃত হতে শুরু করে। ব্যবহারকারীরা সাবেক প্রেমিক বা প্রেমিকার কথা বলার ধরন, ভাষা ও আচরণ অনুকরণ করে এমন ভার্চ্যুয়াল চরিত্র তৈরি করতে শুরু করেন। ফলে অনেকের কাছেই এআই সংস্করণের সঙ্গে কথোপকথন বাস্তব মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের অনুভূতি তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বর্তমানে ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী এআই সঙ্গী তৈরির প্রযুক্তি সহজলভ্য হয়ে যাওয়ায় এ ধরনের ব্যবহার আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। যদিও বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে খুব কম মানুষই কথা বলছেন।
বিষয়টি নিয়ে মতভেদও রয়েছে। কেউ এটিকে বিচ্ছেদের মানসিক চাপ সামাল দেওয়ার একটি উপায় হিসেবে দেখছেন। আবার কেউ এটিকে বাস্তবতা এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা বলেও মনে করছেন। প্রতিবেদনে এক ব্যবহারকারীর জানিয়েছেন, পুরো প্রক্রিয়াটি তাঁকে সম্পর্ককে নতুনভাবে বিশ্লেষণ করতে সাহায্য করেছে এবং শেষ পর্যন্ত সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তিও দিয়েছে।
মনোবিজ্ঞানে ‘এম্পটি চেয়ার টেকনিক’ নামে পরিচিত একটি পদ্ধতির সঙ্গে এ অভিজ্ঞতার কিছুটা মিল রয়েছে। এই পদ্ধতিতে একজন ব্যক্তি কল্পনায় তাঁর প্রিয়জন বা সাবেক সঙ্গীকে সামনে বসিয়ে নিজের না বলা অনুভূতি প্রকাশ করেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুটি বিষয় এক নয়। কারণ, থেরাপির এই পদ্ধতি পরিচালিত হয় প্রশিক্ষিত পেশাদারের তত্ত্বাবধানে এবং এর সুস্পষ্ট মানসিক উদ্দেশ্য থাকে। অন্যদিকে এআই চ্যাটবটের নকশাই তৈরি করা হয় ব্যবহারকারীকে দীর্ঘ সময় যুক্ত রাখার জন্য।
বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ‘ফ্রিডম কাউন্সেলিং’-এর থেরাপিস্ট অ্যামি সাটন। তাঁর মতে, একটি সম্পর্ক ভেঙে গেলে মানুষ অনেকটা মৃত্যুশোকের মতো মানসিক অবস্থার মধ্য দিয়ে যায়। তবে এখানে পার্থক্য হলো, সম্পর্কের মানুষটি তখনো জীবিত থাকেন। কিন্তু তাঁর সঙ্গে আর যোগাযোগ করা যায় না কিংবা অনেক প্রশ্নের উত্তরও অমীমাংসিত থেকে যায়। এ কারণেই বিচ্ছেদ মেনে নেওয়া অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। এআইভিত্তিক ‘ডিজিটাল এক্স’ ব্যবহারের মধ্যেও শোকের বিভিন্ন ধাপ প্রতিফলিত হয়। কখনো ব্যবহারকারীর মনে হয়, মানুষটি এখনো তাঁর কাছেই আছেন। কখনো জমে থাকা ক্ষোভ প্রকাশের সুযোগ তৈরি হয়। আবার কারও কারও মধ্যে এমন ধারণাও জন্ম নিতে পারে যে এআই সংস্করণের সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক করা গেলে বাস্তব সম্পর্কও হয়তো ঠিক করা সম্ভব হতো। তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো দীর্ঘমেয়াদি মানসিক নির্ভরতা। এআই হয়তো সাময়িকভাবে এমন অনুভূতি দিতে পারে যে কেউ বিচার না করে আপনার কষ্ট শুনছে। কিন্তু এটি কখনোই বাস্তব মানবিক সম্পর্কের বিকল্প হতে পারে না। শোক কাটিয়ে ওঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো হারিয়ে যাওয়া সম্পর্কের বাইরে নিজের পরিচয় ও অন্য সম্পর্কগুলোকে নতুনভাবে গড়ে তোলা।
সূত্র: টেক রাডার