এআইয়ের কারণে ব্যাংক, ই–মেইল বা ফেসবুক অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা কতটা ঝুঁকিতে
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন আর শুধু মানুষের কাজ সহজ করার প্রযুক্তি নয়। এআই ব্যবহার করে নানা ধরনের প্রতারণা ও হামলা চালাচ্ছে সাইবার অপরাধীরা। এসব সাইবার হামলার ফলে ব্যাংক, ই–মেইল বা ফেসবুক অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা নিয়ে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর এআই-সম্পর্কিত অপরাধে যুক্তরাষ্ট্রে ৮৯ কোটি ৩০ লাখ ডলারের বেশি অর্থ হারিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগ আরও বেড়েছে সাম্প্রতিক দুটি ঘটনায়। গত সপ্তাহে ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, পরীক্ষার সময় তাদের তৈরি এআই এজেন্ট নির্দেশ ছাড়াই ইন্টারনেটে প্রবেশ করে অন্য প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার–ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ করেছে। এসব ঘটনায় গ্রাহকদের তথ্য ফাঁস না হলেও এআইয়ের সক্ষমতা কীভাবে সাইবার হামলায় ব্যবহৃত হতে পারে, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সাইবার নিরাপত্তাপ্রতিষ্ঠান ক্রাউডস্ট্রাইকের ২০২৬ সালের ‘থ্রেট হান্টিং’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যবসায়িক কার্যক্রমে গতি আনতে ব্যবহৃত এআই মডেল, স্বয়ংক্রিয় টুল ও লার্জ ল্যাংগুয়েজ মডেলের (এলএলএম) ব্যবহার যত বাড়ছে, সাইবার হামলার ঝুঁকিও তত বিস্তৃত হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, করপোরেট নেটওয়ার্কের বিস্তার, নতুন নতুন ডিভাইস সংযুক্ত হওয়া এবং বিভিন্ন কাজে এআই ব্যবহারের ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো অজান্তেই এমন এক ডিজিটাল পরিসর তৈরি করছে, যেখানে নিরাপত্তার ফাঁক থেকে যাচ্ছে। এসব দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে হামলাকারীরা তথ্য চুরি, এআই মডেলে অননুমোদিত প্রবেশ, নজরদারি বা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন কাজ করতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কোনো সফটওয়্যারের দুর্বলতা প্রকাশ হওয়ার পর সেটি কাজে লাগিয়ে হামলা চালানোর সময় দ্রুত কমে আসছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে ক্রাউডস্ট্রাইক যে হামলাগুলো শনাক্ত করেছে, তার ৮৮ শতাংশই কোনো দুর্বলতার পরীক্ষামূলক কোড বা প্রুফ অব কনসেপ্ট (পিওসি) প্রকাশের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে শুরু হয়েছে। ভার্জিনিয়া কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ক্রিস হোয়াইটের মতে, সাইবার অপরাধীদের হাতে এআই এখন আগের চেয়ে বেশি সহজলভ্য, সস্তা এবং কার্যকর একটি হাতিয়ার। ফলে প্রতারণার কৌশলও দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
এআই ব্যবহার করে পরিচালিত প্রতারণা থেকে নিরাপদ থাকতে নিচের চারটি বিষয় সম্পর্কে জানতে হবে।
১. ডিপফেক ভিডিও চেনা
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ডেটা অ্যানালিটিকস প্রতিষ্ঠান গ্যালাপের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে প্রতারণার শিকার হওয়া প্রায় ১২ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে হওয়া প্রতারণায় এআই বা ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল। মাইক্রোসফট টিমস বা জুমের মতো ভিডিও বৈঠকের প্ল্যাটফর্মেও ডিপফেক ব্যবহার করা সম্ভব। যেমন তারকা, প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) বা পরিচিত ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তিদের মুখ নকল করে প্রতারণা চালানো হচ্ছে। তবে এ ধরনের নকল ভিডিও সব সময় নিখুঁত হয় না। ভিডিও কলে থাকা ব্যক্তির পরিচয় নিয়ে সন্দেহ হলে তাঁকে মাথা ঘোরাতে বা দাঁড়িয়ে ঘুরতে বলা যেতে পারে। ক্যামেরার সামনে নড়াচড়া করলে কৃত্রিমভাবে তৈরি মুখের অসংগতি ধরা পড়ে যায়। কোনো ব্যক্তি বা ভিডিওতে থাকা কেউ যদি টাকা, ব্যাংক হিসাবের তথ্য কিংবা অনলাইন অ্যাকাউন্টে প্রবেশের অনুমতি চান, তবে তা সরাসরি বিশ্বাস করা যাবে না। পরিচিত ও নির্ভরযোগ্য মাধ্যমে অনুরোধটি আগে যাচাই করে নিতে হবে।
২. নকল কণ্ঠস্বর শনাক্ত
এআই দিয়ে এখন মানুষের কণ্ঠস্বর অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নকল করা যায়। অপরাধীরা পরিবারের সদস্য বা ঘনিষ্ঠজন সেজে বিপদে পড়ার কথা বলে দ্রুত টাকা দাবি করে। ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক লরেল কুক জানান, মানুষ যেন ভয় বা উৎকণ্ঠার মধ্যে পড়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়, প্রতারকেরা সেই সুযোগই কাজে লাগায়। এফবিআইয়ের তথ্যমতে, গত বছর এই কৌশলে ভুক্তভোগীরা ৫০ লাখ ডলারের বেশি হারিয়েছেন। ভার্জিনিয়া কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক অধ্যাপক ক্রিস হোয়াইটের মতে, মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ভয়েস নমুনা থেকেই এআই ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত মিল থাকা কণ্ঠস্বর বানিয়ে ফেলতে পারে। কিন্তু সাধারণ মানুষ মাত্র ৬০ শতাংশ ক্ষেত্রে এটি কৃত্রিম কি না, তা ধরতে পারেন। ফোনের অপর প্রান্তের ব্যক্তির পরিচয় নিয়ে সন্দেহ হলে কলটি কেটে দিয়ে পরিচিত বা নির্ভরযোগ্য অন্য নম্বরে যোগাযোগ করতে হবে।
৩. পাসওয়ার্ড সুরক্ষা
এআই এখন পাসওয়ার্ড সরাসরি ভাঙার চেয়ে ফাঁস হওয়া পাসওয়ার্ড ও ব্যক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করে পাসওয়ার্ড অনুমান করতে বেশি পটু। ইউনিভার্সিটি অব বাফেলোর পরিচালক সিওয়ে লিউ জানান, ফাঁস হওয়া পাসওয়ার্ডের ধরন দেখে এআই খুব দ্রুত সম্ভাব্য পাসওয়ার্ড তৈরি করে ফেলে। নিরাপত্তা বাড়াতে অন্তত ১২ অক্ষরের দীর্ঘ পাসওয়ার্ড ব্যবহারের পাশাপাশি মাল্টি ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন ব্যবস্থা চালু করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। পাসকি ও পাসওয়ার্ড ব্যবস্থাপনার সফটওয়্যার ব্যবহার করাও নিরাপদ। পাসওয়ার্ডে একটি বড় হাতের অক্ষর, একটি সংখ্যা ও একটি বিশেষ চিহ্ন থাকতেই হবে—এ ধরনের নির্দিষ্ট নিয়ম অনেক সময় হ্যাকারদের জন্য পাসওয়ার্ড অনুমানের কাজ সহজ করে দিতে পারে। এর পরিবর্তে কবিতার কোনো লাইন বা সহজে মনে রাখা যায়, এমন দীর্ঘ বাক্য পাসওয়ার্ড হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
৪. ভুয়া ক্যাপচা ও ক্ষতিকর অ্যাপ ব্যবহার না করা
অনলাইন প্রতারণার নতুন কৌশল হলো ভুয়া ক্যাপচা। সাধারণ ক্যাপচায় কোনো ঘরে টিক দিতে বা ছবি মেলাতে বলা হয়। কিন্তু ভুয়া ক্যাপচায় কম্পিউটারে কোনো কমান্ড বা নির্দেশ লিখতে, সফটওয়্যার ডাউনলোড করতে বা নিরাপত্তা সেটিংস পরিবর্তন করতে বলা হয়। এসব নির্দেশ মানলে অজান্তেই ক্ষতিকর সফটওয়্যার (ম্যালওয়্যার) ইনস্টল হয়ে যায়। এ ছাড়া ক্ষতিকর অ্যাপকে ই-মেইল, কন্টাক্ট লিস্ট বা ফাইলের অনুমতি দিলে ব্যক্তিগত তথ্য চুরি হতে পারে। এ জন্য গুগল বা মাইক্রোসফট অ্যাকাউন্টে কোন কোন অ্যাপ যুক্ত আছে, তা নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের সিকিউরিটি সেটিংস থেকে অন্য কোনো অজানা ডিভাইসে অ্যাকাউন্ট লগইন করা আছে কি না, তা যাচাই করতে হবে।
সূত্র: জেডডিনেট ও স্ক্রিপসনিউজ