সভায় কি জাকারবার্গ নন, হাজির হবে তার এআই ক্লোন

মার্ক জাকারবার্গের ডিজিটাল সংস্করণ বানানোর চেষ্টা চলছেছবি: মেটা

একঘেয়ে ও দীর্ঘ বৈঠক এড়াতে নিজের ডিজিটাল সংস্করণ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন মার্ক জাকারবার্গ। এমনটাই জানিয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস। প্রতিবেদনে বলা হয়, নিজের পরিবর্তে কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই–চালিত একটি ‘ক্লোন’ তৈরির কাজ এগিয়ে নিচ্ছে মেটা। এ উদ্যোগ সফল হলে ভবিষ্যতে কনটেন্ট নির্মাতারাও নিজেদের এআই সংস্করণ তৈরির সুযোগ পেতে পারেন।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত এই এআই চ্যাটবট জাকারবার্গের হয়ে কর্মীদের সঙ্গে কথোপকথনে অংশ নেবে। এর মাধ্যমে কর্মীরা প্রতিষ্ঠাতার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের মতো অভিজ্ঞতা পাবেন। শুধু কথোপকথন নয়, কর্মীদের মতামত নেওয়া, প্রতিক্রিয়া জানানো এবং অভ্যন্তরীণ আলোচনায় অংশ নেওয়ার কাজেও এই ‘অ্যানিমেটেড ক্লোন’ ব্যবহার করা হতে পারে। এর আগে মানুষের মতো স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে সক্ষম ফটো রিয়ালিস্টিক ত্রিমাত্রিক চরিত্র তৈরির পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল মেটা। তবে সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, এখন প্রকৌশলীদের কাছে জাকারবার্গের ব্যক্তিগত ত্রিমাত্রিক সংস্করণ তৈরিই অগ্রাধিকার পাচ্ছে।

এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মডেলকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে জাকারবার্গের কথাবলার ধরন, কণ্ঠস্বর, প্রকাশ্যে দেওয়া বক্তব্য এবং প্রতিষ্ঠানের কৌশলগত অবস্থান থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে। তার ছবি ও কণ্ঠস্বরের রেকর্ডিংও এতে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রশিক্ষণের প্রক্রিয়ায় জাকারবার্গ নিজেও যুক্ত রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এআই খাতে প্রতিযোগিতা বাড়ার প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক সময়ে বিনিয়োগ জোরদার করেছে মেটা। বিশেষ করে ওপেনএআই ও আনথ্রপিকের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পাল্লা দিতে বিভিন্ন প্রকল্পে গুরুত্ব দিচ্ছে তারা। একটি সূত্র জানায়, জাকারবার্গ এখন প্রতি সপ্তাহে ৫ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত নিজে কোডিং করেন এবং বিভিন্ন কারিগরি পর্যালোচনা বৈঠকেও অংশ নেন। তবে ‘এআই জাকারবার্গ’ প্রকল্পটি ‘সিইও এজেন্ট’ উদ্যোগ থেকে আলাদা। ‘সিইও এজেন্ট’ মূলত এমন একটি এআই, যা তথ্য সংগ্রহসহ প্রশাসনিক বিভিন্ন কাজে জাকারবার্গকে সহায়তা করার জন্য তৈরি করা হচ্ছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে বেশ কিছু প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জও সামনে এসেছে। বাস্তবসম্মত অভিজ্ঞতা দিতে বিপুল কম্পিউটিং শক্তির প্রয়োজন হচ্ছে। একই সঙ্গে মানুষের মতো স্বাভাবিক ও তাৎক্ষণিক কথোপকথন নিশ্চিত করাও প্রকৌশলীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কণ্ঠভিত্তিক এআই প্রযুক্তি উন্নত করতে সম্প্রতি প্লে এআই ও ওয়েভফর্মস নামের দুটি প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ করেছে মেটা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ উদ্যোগ সফল হলে ভবিষ্যতে কনটেন্ট নির্মাতাদেরও নিজেদের এআই সংস্করণ তৈরির সুযোগ দেওয়া হতে পারে। ২০২৪ সালে এক উপস্থাপনায় এআইনির্ভর ‘ভিডিও কল’ সুবিধা প্রদর্শন করেছিল মেটা। সেই প্রদর্শনীতে বাস্তব একজন কনটেন্ট নির্মাতার আদলে তৈরি একটি এআই বটের সঙ্গে কথোপকথন করতে দেখা যায় জাকারবার্গকে। তবে সেই প্রদর্শনীতে প্রতিক্রিয়ায় বিলম্ব এবং সীমিত উত্তর দেওয়ার প্রবণতা স্পষ্ট ছিল।

পরবর্তী সময়ে ইনস্টাগ্রামে মন্তব্যের জবাব দেওয়ার জন্য কনটেন্ট নির্মাতাদের নিজস্ব এআই সংস্করণ তৈরির সুযোগ দেয় প্রতিষ্ঠানটি। ‘এআই স্টুডিও’ নামের এই সুবিধার মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা নিজেদের ভার্চ্যুয়াল চরিত্র তৈরি করতে পারতেন। তবে অনাকাঙ্ক্ষিত ও আপত্তিকর কনটেন্ট তৈরির অভিযোগ ওঠায় চলতি বছরের জানুয়ারিতে কিশোরদের জন্য এই সুবিধা সীমিত করা হয়।

এদিকে গত সপ্তাহে ‘মিউজ স্পার্ক’ নামের নতুন একটি এআই পণ্য উন্মোচন করেছে মেটা। এটি গত বছর গঠিত একটি বিশেষায়িত এআই দলের প্রথম পণ্য। এই দলে যোগ দিতে অ্যালেক্স ওয়াংয়ের মতো শীর্ষ নির্বাহীদের বড় অঙ্কের পারিশ্রমিকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এই মডেল মেটা এআই অ্যাপ ও ওয়েবসাইটে উন্মুক্ত করা হবে। পরে ধাপে ধাপে হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুকসহ প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে এটি চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। মূল্যায়নে দেখা গেছে, ভাষা ও দৃশ্যগত বোঝার ক্ষেত্রে এটি শীর্ষ এআই মডেলগুলোর কাছাকাছি পৌঁছালেও কোডিং সক্ষমতায় কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে। অন্যদিকে কর্মীদের নিজ নিজ কাজেও এআই ব্যবহারে উৎসাহিত করছে মেটা। উন্মুক্ত উৎসভিত্তিক সফটওয়্যার ব্যবহার করে কাজ স্বয়ংক্রিয় করা এবং নিজস্ব এআই তৈরি করে দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

এআই নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অ্যানথ্রপিক সম্প্রতি ‘মাইথোস’ নামের একটি মডেল তৈরি করেছে, যেটিকে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এই মডেল হাসপাতাল, বিদ্যুৎ গ্রিডসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় সাইবার হামলার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। পরীক্ষায় এটি বিভিন্ন অপারেটিং সিস্টেম ও ওয়েব ব্রাউজারে হাজারো গুরুতর দুর্বলতা শনাক্ত করেছে।

‘প্রজেক্ট গ্লাসউইং’ নামের একটি উদ্যোগের আওতায় অ্যামাজন, গুগল, অ্যাপলসহ ৪০টির বেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে সীমিত পরিসরে এই মডেল সরবরাহ করা হবে।

এ বিষয়ে মেটার আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি।

সূত্র: ডেইলি মেইল