এআই জগতে বাংলাদেশের হাসিবুল হকের চমক
যাঁরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইভিত্তিক চ্যাটবট ব্যবহার করেন, তাঁরা একটা বিষয় খেয়াল করে দেখবেন, প্রতিবার চ্যাটবট যখন বন্ধ করা হয়, তখন আগের কোনো কিছু চ্যাটবট বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মনে রাখতে পারে না। এখানেই ব্যতিক্রম যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালির একটি স্টার্টআপ। এর নাম কজাল ডায়নামিকস ল্যাব (সিডিএল)।
এই স্টার্টআপের সিয়েলারা নামের এআই টুলটি আগের প্রশ্ন মনে রাখতে পারে, যতবারই চ্যাটবট বন্ধ করেন না কেন। ফলে বড় বড় প্রতিষ্ঠান বা এন্টারপ্রাইজের সব তথ্য আরও ভালোভাবে মনে রেখে বিশ্লেষণ করতে পারে। সিয়েলারা সিডিএলের একটি টুল, একে তারা বলছে ওয়ার্ল্ড মডেল। সিডিএল এআইয়ের বিভিন্ন মডেল বানায়।
প্রিয় পাঠক, প্রশ্ন উঠতে পারে যেখানে আমরা অত্যাধুনিক এআইয়ের শুধু ব্যবহার সবে শুরু করেছি, সেখানে সিলিকন ভ্যালির এক প্রতিষ্ঠান নিয়ে কেন কথা বলছি। কারণ, সিডিএলের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হাসিবুল হক বাংলাদেশি এবং প্রতিষ্ঠানটিতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী রয়েছেন। তবে কোম্পানিটা যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক। আর হাসিবুল হক ও তাঁর কোম্পানির বাংলাদেশি কর্মীদের সবাই বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) স্নাতক।
হোয়াটসঅ্যাপে প্রথম আলোকে হাসিবুল হক বলেন, ‘২০২৪ সালের অক্টোবরে এই কোম্পানিটা শুরু করি। এরই মধ্যে আমরা মূল কিছু এআই কোডিং বা প্রোগ্রামিংয়ের ক্ষেত্রে ওপেনএআই ও অ্যানথ্রোপিকের চেয়ে ভালো কাজ করছি।’
সিডিএল যে মানদণ্ড দাঁড় করিয়েছে, তা একটি উন্মুক্ত স্কোরবোর্ড তৈরি করেছে। সব প্রতিযোগী এটা টপকে যেতে চাইবে। এই প্রতিযোগিতা প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেতাদের জন্যই সুফল বয়ে আনবে।
বিশ্বখ্যাত ফোর্বস সাময়িকী বলছে, এন্টারপ্রাইজের জন্য নিরাপদ এআই তৈরি করছে সিডিএল। ইয়াহু ফাইন্যান্স লিখেছে, বেশ কটি কোডিং পরীক্ষায় ওপেনএআই ও অ্যানথ্রোপিককে পেছনে ফেলেছে সিডিএল। বিশেষায়িত গণমাধ্যম পারপ্লেক্সিটি ডট এআই, এফিশিয়েন্টলিকানেকটেড ডটকমও একই রকম সংবাদ প্রচার করেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার গণমাধ্যম কোরিয়া আইটি টাইমস সম্প্রতি হাসিবুল হকের একটি বিশেষ সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে, যেখানে শিরোনাম ছিল, ‘এআই কোডিং এজেন্টরা এখনো প্রোডাকশন বাস্তবতা বুঝতে পারে না।’ ওই সাক্ষাৎকারে তিনি ব্যাখ্যা করেন কেন এন্টারপ্রাইজ পর্যায়ের সফটওয়্যার যাচাইয়ের জন্য সিডিএলের ‘প্রোডাকশন ওয়ার্ল্ড মডেল’ অপরিহার্য হয়ে উঠছে।
প্রযুক্তিবিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান এফিশিয়েন্টলি কানেকটেড-এর মূল্যায়নে বলা হয়েছে, সিডিএল গবেষণা করে দেখিয়েছে এআই এজেন্টগুলো কোড এডিট করার চেয়ে ৮০ শতাংশের বেশি সময় শুধু কোড খোঁজাখুঁজি করতে ব্যয় করে, যা বড় বড় এআই ল্যাবগুলোর জন্য উপেক্ষা করা বেশ কঠিন হবে। ধারণা করা যায়, নিজেদের তথ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ঘটাতে অ্যানথ্রোপিক, ওপেনএআই বা গুগলের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলো ১২ থেকে ১৮ মাস সময় লেগে যেতে পারে। আর সিডিএল যে মানদণ্ড দাঁড় করিয়েছে, তা একটি উন্মুক্ত স্কোরবোর্ড তৈরি করেছে। সব প্রতিযোগী এটা টপকে যেতে চাইবে। এই প্রতিযোগিতা প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেতাদের জন্যই সুফল বয়ে আনবে।
কেন সিডিএল অনন্য
কেন হাসিবুল হকের সিডিএল অনন্য, তা আরেকটু বোঝা যাক। হাসিবুল বললেন, ‘ওপেনএআই, অ্যানথ্রোপিক বা এখনকার এআই মডেলগুলো ১০ লাখ টোকেনের ভিত্তিতে চিন্তাভাবনা করতে পারে। কিন্তু সিডিএলের মডেলটি সাড়ে ১২ কোটি টোকেন নিয়ে কাজ করতে পারে। এটা আমাদের বড় একটা অ্যাচিভমেন্ট।’
আমি ইচ্ছে করেই ঢাকা থেকে প্রকৌশলী নিয়োগ দিয়েছি, যাতে দেশের তরুণ প্রকৌশলীদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সর্বশেষ প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষিত করে তুলতে পারি।হাসিবুল হক, সিডিএলের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা
তাঁর মতে, এ কারণে সিয়েলারা একটি কোম্পানির সব কোড ও ডকুমেন্ট তার মেমোরিতে রাখতে পারে। শুধু তা-ই নয়, সিয়েলারা ‘কন্টিনিউয়াস লার্নিং’ বা ধারাবাহিক শেখার সক্ষমতাসম্পন্ন—অর্থাৎ গ্রাহক প্রতিষ্ঠানের কোডবেস ও প্রোডাকশন সিস্টেম যত পরিবর্তিত হয়, সিডিএলের কজাল মডেলও ততই নতুন তথ্য আত্মস্থ করে নিজেকে হালনাগাদ রাখে। ফলে বোঝা যায় সিডিএল কেন অনন্য। প্রযুক্তিবিশ্বে অর্থাৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিতে এই বিষয় প্রশংসা কুড়িয়েছে।
হাসিবুলের বেড়ে ওঠা
হাসিবুল হকের জন্ম ও বেড়ে ওঠা যশোরে। তাঁর বাবা এস এম সিরাজুল হক ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং পেশায় শিক্ষক। মা হাসিনা খাতুন। তাঁর এক বোন ঢাকায় থাকেন। হাসিবুল যশোর জিলা স্কুল থেকে ১৯৯৫ সালে এসএসসি পাস করেন। এরপর ঢাকায় নটর ডেম কলেজ থেকে ১৯৯৭ সালে এইচএসসি পাস করে বুয়েটের কম্পিউটারবিজ্ঞান ও কৌশল (সিএসই) বিভাগে ভর্তি হন। ২০০৪ সালে সিএসই বিভাগের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ২০০৮ সাল পর্যন্ত শিক্ষকতা করেন। এরপর পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি করতে, তবে পিএইচডি অসমাপ্ত রেখেই যোগ দেন মাইক্রোসফটে।
স্টার্টআপ কোম্পানি দিয়ে শুরু
হাসিবুল বলেন, ‘মাইক্রোসফট ছেড়ে নিজের একটা স্টার্টআপ কোম্পানি করি ২০১২ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত। পরে সেই স্টার্টআপ বিক্রি করে দিই।’ এরপর হাসিবুল যোগ দেন প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান ভিএমওয়্যারে। সর্বশেষ তিনি কাজ করেছেন উবারে, সেখানে তিনি প্ল্যাটফর্ম ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশ্বের ৮০টির বেশি দেশে উবারের রাইড শেয়ারিং ও ডেলিভারি সেবা পরিচালনা করে উবার। পরে তিনি ২০২৪ সালে সিডিএল প্রতিষ্ঠা করেন।
ঢাকায় থেকেও কাজ
সিডিএলে মোট ২০ জন কর্মী। ৫ জন গবেষক, বাকিরা দক্ষ সফটওয়্যার প্রকৌশলী। আমি ছাড়া আরও বেশ কয়েকজন বুয়েটের স্নাতক কাজ করছেন। ৯ জন কাজ করেন ঢাকা থেকে। হাসিবুল হক বলেন, ‘আমি ইচ্ছে করেই ঢাকা থেকে প্রকৌশলী নিয়োগ দিয়েছি, যাতে দেশের তরুণ প্রকৌশলীদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সর্বশেষ প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষিত করে তুলতে পারি।’
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দুনিয়ায় অ্যানথ্রোপিক, ওপেনএআই বা গুগলের মতো প্রতিষ্ঠান থাকলে অন্য কারও পক্ষে তেমন চমক দেখানো সহজ কথা নয়। সেই কঠিন কাজটাই করে যাচ্ছে সিডিএল।
যুক্তরাষ্ট্রে হাসিবুল হকের সঙ্গে যে দুজন বাংলাদেশি কাজ করেন, তাঁরা হলেন হেড অব এজেন্টিক ইঞ্জিনিয়ারিং হিসেবে এস এম মাহবুব মোর্শেদ (ম্যাক্স মোর্শেদ) ও গবেষণা বিজ্ঞানী হিসেবে শুভাশীষ রায়। বাংলাদেশ থেকে যে দল কাজ করে, তার নেতৃত্বে আছেন হেড অব ইঞ্জিনিয়ারিং আজমত ইকবাল। আরও আছেন এম এ আলিম, জান্নাতুল নাইম, মেহরান কাদের, নশীন নাওয়াল, হোসেন মাহমুদ, তৌহিদুল ইসলাম, আতিকুর রহমান ও সুমন সেলিম। সিডিএলের গবেষণা শাখা ‘কজাল ডায়নামিকস ল্যাবস’-এ গবেষণা-বিজ্ঞানী হিসেবে যুক্ত আছেন লিয়াং ঝাও ও শুচাও ঝাংয়ের মতো খ্যাতিমানেরা।
কাজ করে যাচ্ছে সিডিএল
সিডিএল এরই মধ্যে বিনিয়োগ হিসেবে পেয়েছে ৮০ লাখ মার্কিন ডলার। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের তালিকা ‘ফরচুন ৫০০’-এর ৪০টির বেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এখন কাজ করছে সিডিএল। এই মুহূর্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দুনিয়ায় অ্যানথ্রোপিক, ওপেনএআই বা গুগলের মতো প্রতিষ্ঠান থাকলে অন্য কারও পক্ষে তেমন চমক দেখানো সহজ কথা নয়। সেই কঠিন কাজটাই করে যাচ্ছে সিডিএল। আর এর নেতৃত্বে আছেন বাংলাদেশের সন্তান হাসিবুল হক ও তাঁর সহকর্মী বাংলাদেশিরা।