স্বয়ংক্রিয় চিকিৎসাসহায়ক এআই কেয়ারনিকা বানালেন প্রণব
রোগী দেখার সময় কলমে বা কম্পিউটারে মেডিক্যাল নোট লেখা আর পুরোনো ফাইলের তথ্য ঘেঁটে ব্যবস্থাপত্র বা প্রেসক্রিপশন তৈরি করতেই দেশের চিকিৎসকদের একটি বড় সময় পার হয়ে যায়। ফলে রোগীর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনার ফুরসত পান না অনেকেই। এই বাস্তব সমস্যার এক সর্বাধুনিক ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিভিত্তিক সমাধান নিয়ে এসেছে দেশীয় উদ্যোগ এআই কেয়ারনিকা। এটি স্বয়ংক্রিয় চিকিৎসাসহায়ক এআই, যা চিকিৎসক ও রোগীর স্বাভাবিক কথোপকথন শুনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্লিনিক্যাল নোট ও ব্যবস্থাপত্র তৈরি করতে সক্ষম। পেশায় আইটি কনসালট্যান্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন শিক্ষক প্রণব বন্ধু নাথের প্রায় চার বছরের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা, গবেষণা ও পরীক্ষার ফসল এই কেয়ারনিকা।
কাজের পদ্ধতি ও আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যে সুকি বা ড্যাক্সের মতো এআই চিকিৎসকদের চিকিৎসা–সংক্রান্ত নথি তৈরিতে সহায়তা করছে। কেয়ারনিকা একই ধারণাকে বাংলাদেশের চিকিৎসাব্যবস্থা ও বাংলা ভাষার উপযোগী করে গড়ে তুলেছে। তবে এটি শুধু একটি কথা থেকে লেখায় রূপান্তরের টুল নয়। রোগী দেখার সময় চিকিৎসক যখন স্বাভাবিকভাবে বাংলা বা বাংলা-ইংরেজি মিশিয়ে কথা বলেন, কেয়ারনিকা তা শুনে খসড়া ব্যবস্থাপত্র, রোগীর সারসংক্ষেপ তৈরি করে দেবে। এতে চিকিৎসকের সময় যেমন বাঁচবে, তেমনি বাড়বে কাজের গতি। তবে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত এআই নেবে না; চিকিৎসক সবকিছু ভালো করে পর্যালোচনা ও পরীক্ষা করে অনুমোদন দিলেই কেবল ব্যবস্থাপত্র বা ফাইল চূড়ান্ত হবে।
ব্যবস্থাপত্রে অতিরিক্ত নিরাপত্তা
কেয়ারনিকাতে যুক্ত রয়েছে একটি বিশেষ ক্লিনিক্যাল নিরাপত্তা স্তর। ব্যবস্থাপত্র তৈরি করার সময় কোনো একটি ওষুধের সঙ্গে অন্যটির প্রতিক্রিয়া, একই ধরনের ওষুধের পুনরাবৃত্তি কিংবা রোগীর নির্দিষ্ট কোনো রোগে ওই ওষুধের ঝুঁকি রয়েছে কি না, তা সঙ্গে সঙ্গে শনাক্ত করে চিকিৎসককে সতর্ক করবে এই সিস্টেম। অর্থাৎ, এটি চিকিৎসার সুরক্ষায় একজন ডিজিটাল সহকারীর ভূমিকা পালন করবে।
এক জায়গায় সম্পূর্ণ চিকিৎসা–সেবা
শুধু কথা শুনে নোট তৈরি করাই কেয়ারনিকার কাজ নয়; এতে রয়েছে একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিক্যাল ইকোসিস্টেম। পুরোনো ল্যাব রিপোর্ট ও কাগজ স্ক্যান করে পড়া, রেফারেল চিঠি তৈরি, পরবর্তী পরিদর্শনের বার্তা এবং রোগীর স্বাস্থ্যগত ইতিহাসের সময়রেখা এক ছাদের নিচে সামলানো সম্ভব।
চিকিৎসার ধারাবাহিকতা ও ডিজিটাল স্বাস্থ্য সংরক্ষণ
রোগী একাধিক চিকিৎসকের কাছে গেলে আগের চিকিৎসাপত্র ও পরীক্ষার কথা যাতে ভুলে না যান, সে জন্য কেয়ারনিকা প্রতিটি সাক্ষাতের তথ্য নিখুঁতভাবে ধরে রাখে। ফলে কী বলা হয়েছিল, কী চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল এবং ফল কী হলো—তার একটি ধারাবাহিক ও নির্ভরযোগ্য রেকর্ড তৈরি হয়, যা রোগী ও চিকিৎসক—উভয়ের মধ্যকার স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতা বাড়ায়। এমনকি দীর্ঘদিন চিকিৎসা করেও রোগী সুস্থ না হলে আগের সব ইতিহাস বিশ্লেষণ করে এআই সম্ভাব্য সমস্যা বা ঘাটতি চিকিৎসকের সামনে তুলে ধরতে পারে।
গবেষণা ও দেশের নিজস্ব চিকিৎসাবিষয়ক বুদ্ধিমত্তা পরিকাঠামো
কেয়ারনিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর গবেষণা ও একাডেমিক সহযোগিতা। মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা (প্রাইভেসি), সম্মতি ও নিরাপত্তা বজায় রেখে কেয়ারনিকার উপাত্ত থেকে দেশের অঞ্চলভিত্তিক রোগের প্যাটার্ন, পরিবেশগত প্রভাব এবং চিকিৎসার কার্যকারিতা নিয়ে মৌলিক গবেষণা করা সম্ভব। প্রণব বন্ধু নাথ বলেন, ‘আমরা বিদেশের প্রযুক্তির ওপর নির্ভর না করে দেশের নিজস্ব চিকিৎসাব্যবস্থা, রোগের ধরন ও ভাষার ওপর ভিত্তি করে কেয়ারনিকা তৈরি করেছি। সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এটি কেবল একটি বাণিজ্যিক সফটওয়্যার থাকবে না; বরং বাংলাদেশের নিজস্ব চিকিৎসাবিষয়ক বুদ্ধিমত্তা পরিকাঠামো হিসেবে দাঁড়িয়ে যাবে।’ তিনি আরও মনে করেন, ভবিষ্যতে স্বল্প সম্পদের দেশগুলোতে এবং অন্যান্য ভাষার বাজারেও এই প্রযুক্তি রপ্তানি করে দেশের জন্য বড় ধরনের ডিজিটাল স্বাস্থ্য রাজস্ব অর্জনের সুযোগ রয়েছে।
বর্তমানে কেয়ারনিকা উৎপাদন পর্যায়ে রয়েছে এবং মাঠপর্যায়ে বাস্তব চিকিৎসাকাজে এর কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হচ্ছে। বিদেশের প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে নিজেদের উপাত্ত ও মেধা দিয়ে আন্তর্জাতিক মানের এআই প্রযুক্তি তৈরির এই প্রয়াস দেশের চিকিৎসা খাতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।