আশির দশকের ফটো ট্রেন্ডে মেতেছেন ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারীরা

এআই দিয়ে নিজের আশির দশকের ছবি তৈরি করে প্রকাশ করছেন অনেকেকোলাজ ছবি: প্রথম আলো

গত দুই দিন ধরেই ফেসবুক আর ইনস্টাগ্রামের ফিড ও স্টোরিতে আশির দশকের আবহ দেখা যাচ্ছে। ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে আশির দশকের আবহে ছবি তোলার ট্রেন্ড বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ব্যবহারকারীরা তাঁদের ছবি গুগল জেমিনাই বা চ্যাটজিপিটিতে আপলোড করে আশির দশকের আদলে নতুন রূপ দিচ্ছেন। বিশ্বের নানা দেশে ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে এই ট্রেন্ড বেশ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। মানুষ তাঁদের পছন্দের প্রম্পট শেয়ার করে অন্যদেরও অংশ নিতে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন। ছবিগুলো দেখলে মনে হয় এগুলো চল্লিশ বছর আগের কোনো ক্যামেরায় ধারণ করা। একেকটি ছবি একেক রকম লুক ফুটিয়ে তোলে। কিছু ছবি পুরোনো হলিউড বা বলিউড স্টুডিওর কথা মনে করিয়ে দেয়। আবার কিছু ছবি ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ বা পারিবারিক অ্যালবামের মতো দেখায়।

আশির দশকের আবহে ছবি প্রকাশ করেছেন ফাহমিদা মেহবুবা
ছবি: সংগৃহীত

যে ধরনের ছবি দেখা যাচ্ছে

১৯৮০ দশকের ছবি হিসেবে বিভিন্ন ছবিতে উষ্ণ আলো, উজ্জ্বল রং, সফট ফোকাস ও গ্রেইনযুক্ত টেক্সচার ছবিগুলো বেশি দেখা যাচ্ছে। ১৯৮০ দশকের রঙিন শাড়ি, বড় কোঁকড়ানো চুল ও মানানসই গহনা ব্যবহার করা হয়েছে ছবিগুলোয়। পুরুষদের ক্ষেত্রে শার্ট, হাই-ওয়েস্টেড ট্রাউজার, গোঁফ ও পরিপাটি চুল দেখা যাচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মেঘলা আলম শাড়ি পরে আশির দশকের স্টাইলে ছবি প্রকাশ করে জানান, এই ধরনের এআই ট্রেন্ড পুরোনো সোনালি দিনগুলোকে চোখের সামনে ফিরিয়ে এনে নস্টালজিয়া তৈরি করে। তরুণ শিক্ষার্থী তসলিমা খান ঊষা লাল ব্লাউজ ও শাড়ির ছবি প্রকাশ করেন। তিনি জানান, ‘বর্তমান প্রজন্মের কাছে এই ভিন্টেজ লুক অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও ফ্যাশনেবল একটি অভিজ্ঞতা। আমার বন্ধুরা দারুণ আগ্রহ নিয়ে ছবি শেয়ার করছে। এটা তৈরি করতে খুব বেশি কারিগরি জ্ঞান লাগে না।’

আলামিন মোহাম্মদ আশির দশকের ধারায়
ছবি: সংগৃহীত

জনস্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষক ইরফাত জেবীন নিজের দাম্পত্যসঙ্গীর সঙ্গে আশির দশকের স্টাইলে ছবি তৈরি করেছেন। তিনি জানান, ‘ছবিতে নানা যুগলের পুরোনো দিনের সাজপোশাক দেখতে বেশ চমৎকার ও আনন্দদায়ক লাগছে। আমি সিডনি, মেলবোর্ন ও ঢাকার লোকেশনে ছবি তৈরি করেছি।’

পেশাজীবী লুৎফুন নাহার নিজের দাম্পত্যসঙ্গীর সঙ্গে আশির দশকের স্টাইলে ড্রইংরুমে দাঁড়ানো একটি ছবি প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, ‘এই ডিজিটাল রূপান্তর পুরোনো স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার দারুণ সুযোগ।’ বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা ফাহিমা আহমেদ ১৯৮০ দশকের আরবান স্টাইলের ছবি প্রকাশ করে জানান, ‘সেকালের শহুরে ফ্যাশন এবং আধুনিক প্রযুক্তির এই মেলবন্ধন খুবই উপভোগ্য।’

আশির দশকের ছবি বানাবেন যেভাবে

চ্যাটজিপিটের মাধ্যমে এ ধরনের ছবি তৈরি করার পদ্ধতি বেশ সহজ। প্রথমে আপনার ছবি চ্যাটজিপিটে আপলোড করতে হবে। এরপর ছবিটিকে আশির দশকের আদলে তৈরি করার অনুরোধ জানাতে হবে। চুল, পোশাক, গহনা, পটভূমি ও আলোর বিন্যাসের মতো নির্দিষ্ট বিবরণ উল্লেখ করতে হবে। পুরোনো বলিউড স্টুডিও পোর্ট্রেট বা পারিবারিক অ্যালবামের মতো নির্দিষ্ট শৈলী বেছে নেওয়া যায়।

চ্যাটজিপিটে বাংলায় বা ইংরেজিতে নির্দেশনা দেওয়া যাবে। ক্ল্যাসিক বলিউড পোর্ট্রেটের জন্য লিখতে হবে, ‘এই ছবিটিকে আশির দশকের একটি খাঁটি বলিউড স্টুডিও পোর্ট্রেটে রূপান্তর করুন। আমার মুখের বৈশিষ্ট্য এবং পরিচয় যেন স্পষ্টভাবে চেনা যায়। আমাকে আশির দশকের উপযোগী পোশাক, চুলের স্টাইল এবং অলংকার দিন। এর সঙ্গে উষ্ণ স্টুডিও লাইটিং, সফট ফোকাস, হালকা ফিল্ম গ্রেইন এবং কিছুটা বিবর্ণ রং ব্যবহার করুন। এটি দেখে যেন মনে হয় আশির দশকে তোলা একটি আসল ছবি।’ পুরোনো পারিবারিক অ্যালবামের জন্য লিখতে হবে, ‘এই ছবিটি এমনভাবে তৈরি করুন যেন এটি আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে কোনো বাংলাদেশি পারিবারিক ফটো অ্যালবামে তোলা হয়েছিল। ব্যক্তির মুখ ও অভিব্যক্তি প্রাকৃতিক রাখুন। সাধারণ ইনডোর সেটিং, অ্যানালগ ক্যামেরার টেক্সচার, হালকা গ্রেইন, নরম আলো এবং বাস্তবসম্মত ফিল্মের রঙের সঙ্গে মানানসই পোশাক, চুলের স্টাইল ও পটভূমি যুক্ত করুন।’

আশির দশকের সাজে মশিউজ্জামান খান ও শাকিলা জামান
ছবি: সংগৃহীত

আশির দশকের বলিউড বা হলিউডের নায়িকা স্টাইলে ছবি চাইলে লিখতে হবে, ‘এই ছবিটিকে আশির দশকের একজন গ্ল্যামারাস বলিউড নায়িকার পোর্ট্রেটে পরিণত করুন। আমার মুখ চেনা যায় এমন ও স্বাভাবিক রাখুন। আশির দশকের ভলিউমযুক্ত স্টাইলে চুল সাজান, একটি রঙিন শাড়ি এবং আকর্ষণীয় গয়না দিন। আমাকে একটি ক্ল্যাসিক স্টুডিওর পটভূমিতে স্থাপন করুন। উষ্ণ আলো, সফট ফোকাস এবং অ্যানালগ ফিল্ম গ্রেইন ব্যবহার করুন।’

ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ক্ষেত্রে ঝুঁকি

এসব ছবির কারণে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ক্ষেত্রে কিছুটা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে জানিয়েছেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডিয়া, কমিউনিকেশস ও জার্নালিজম বিভাগের শিক্ষক শরিফুল ইসলাম। তিনি জানান, এই ট্রেন্ড মূলত নস্টালজিয়া ও ভিজ্যুয়াল নোভেলটির একটি নিখুঁত মিশ্রণ। মানুষ নিজের পরিচিত সীমার বাইরে গিয়ে ভিন্ন এক যুগে নিজেদের দেখতে পছন্দ করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহজলভ্যতার কারণেই এই ধরনের ট্রেন্ডগুলো খুব দ্রুত ভাইরাল হয়। এটি কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, একই সঙ্গে পুরোনো সংস্কৃতির প্রতি তরুণ প্রজন্মের নতুন আগ্রহের বহিঃপ্রকাশ। ঐতিহ্যের সঙ্গে প্রযুক্তির এমন সৃজনশীল ব্যবহার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতিবাচক এক জোয়ার তৈরি করেছে। তবে এসব ট্রেন্ডের মাধ্যমে বিভিন্ন এআই মডেল অনেক বেশি ব্যবহারকারীর তথ্য সংগ্রহ করছে বলা যায়, যা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।