এআই–নির্ভর প্রেম–ভালোবাসার সম্পর্কের ওপর চীনের কঠোর নিষেধাজ্ঞা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির যুগে মানুষের সঙ্গে রোবট বা ভার্চ্যুয়াল সম্পর্কের প্রবণতা বিশ্বজুড়ে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই আসক্তি ও মানসিক নির্ভরশীলতা রোধ করতে চীন সরকার সম্প্রতি হিউম্যান-লাইক বা মানুষের মতো আচরণ করা এআই চ্যাটবটের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা এবং শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলে এই পদক্ষেপ নিলেও এর পেছনে দেশের জন্মহার বাড়ানো এবং সমাজ নিয়ন্ত্রণের গভীর কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, তা নিয়ে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা।
চলতি বছরের জুলাই মাসে কার্যকর হওয়া নতুন এই নীতিমালায় যেসব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি আবেগঘন আলোচনা তৈরি করতে পারে, সেগুলোর ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ১৪ বছরের কম বয়সীদের জন্য যেকোনো ধরনের এআই চ্যাটবট ব্যবহারের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের অনুমতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাশাপাশি ১৮ বছরের কম বয়সীদের জন্য ভার্চ্যুয়াল সঙ্গী, জীবনসঙ্গী বা এ–জাতীয় কোনো অন্তরঙ্গ সম্পর্কের সুযোগ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য এটি সরাসরি কোনো নিষেধাজ্ঞা না হলেও চ্যাটবটকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে যে তারা কোনো মানুষ নয়। এ ছাড়া ব্যবহারকারী কতক্ষণ অনলাইনে আছেন, তা প্রতি দুই ঘণ্টায় মনে করিয়ে দেওয়ার নিয়মও রাখা হয়েছে।
কঠোর এই নিয়মের ফলে আলিবাবা ও বাইটড্যান্সের মতো চীনের বড় বড় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান তাদের এআই সহকারী থেকে এ–জাতীয় বন্ধু বা কম্প্যানিয়ন ফিচার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে। অক্সফোর্ড চায়না পলিসি ল্যাবের এআই–গবেষক জিলান কিয়ানের মতে, সরকারি প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। গবেষকদের অনেকেই মনে করছেন, এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে চীনের এই আইন বিশ্বজুড়ে একটি বড় নজির স্থাপন করতে পারে।
তবে এই নিয়মের পেছনের আসল উদ্দেশ্য নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। সেন্টার ফর সিকিউরিটি অ্যান্ড ইমার্জিং টেকনোলজির গবেষক স্যাম ব্রেসনিকের মতে, চীনের এই পদক্ষেপের পেছনে জন্মহার বাড়ানোর একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে এক সন্তান নীতির কুফল এবং জন্মহার হ্রাসের ফলে চীন বর্তমানে এক তীব্র জনমিতি সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। তরুণসমাজ বাস্তব মানুষের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ানোর চেয়ে এআই সঙ্গীর প্রতি বেশি আসক্ত হয়ে পড়ায় দেশের জন্মহার আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া ঐতিহ্যগত লিঙ্গ–ভূমিকা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রেও এ ধরনের প্রযুক্তি বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছিল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ভার্চ্যুয়াল সম্পর্কের এই প্রবণতা মানুষের একাকিত্ব দূর করার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি করছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, যারা বাস্তব জীবনে বন্ধুহীন বা একাকী, তারাই এআই চ্যাটবটের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে এবং এটি তাদের আরও বেশি বিচ্ছিন্ন করে তোলে।
সূত্র: বিবিসি