এআই দিয়ে কণ্ঠ নকল করে প্রতারণা বাড়ছে, নিরাপদ থাকবেন যেভাবে
স্মার্টফোনের অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসছে মেয়ের কণ্ঠস্বর। কণ্ঠে আতঙ্ক ও সাহায্যের আকুতি। এমন পরিস্থিতিতে যেকোনো মা–বাবাই দ্রুত সন্তানের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবেন। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় এক নারী সেটিই করেছিলেন। মেয়ের কণ্ঠস্বর বলে বিশ্বাস করে তিনি কয়েক হাজার ডলার পাঠিয়ে দেন। পরে জানতে পারেন, তাঁর মেয়ে কোনো বিপদে ছিলেন না। পুরো ঘটনাটি ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে সাজানো একটি প্রতারণা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির কারণে ‘ভয়েস ক্লোনিং’ বা কণ্ঠস্বর নকল করে প্রতারণার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এখন মাত্র কয়েক সেকেন্ডের আসল অডিও ব্যবহার করেই কোনো ব্যক্তির কণ্ঠস্বরের অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ক্লোন তৈরি করা সম্ভব। ফলে পরিচিত মানুষের কণ্ঠস্বর শুনেও প্রতারণার শিকার হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা (এফবিআই) জানিয়েছে, গত বছর এআই–সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ধরনের প্রতারণায় দেশটির নাগরিকেরা ৮৯ কোটি ৩০ লাখ ডলারের বেশি অর্থ হারিয়েছেন। এসব প্রতারণার মধ্যে ছিল ভয়েস ক্লোনিং, এআই দিয়ে তৈরি ফিশিং ই–মেইল, ভুয়া প্রেমের সম্পর্কের ফাঁদ ও অন্যান্য ডিজিটাল প্রতারণা।
প্রতারকেরা শুধু পরিবারের সদস্য বা বন্ধুদের কণ্ঠস্বরই নয়, সহকর্মী, পরিচিতজন কিংবা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের কণ্ঠস্বরও নকল করতে পারে। এ কারণে যুক্তরাজ্যের স্টারলিং ব্যাংক ও অস্ট্রেলিয়ার কমনওয়েলথ ব্যাংক গ্রাহকদের এ ধরনের প্রতারণা সম্পর্কে সতর্ক করেছে। প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে এআই দিয়ে তৈরি কণ্ঠস্বর এখন এতটাই বাস্তবসম্মত হয়ে উঠেছে যে অধিকাংশ মানুষের পক্ষে সেটি আসল না নকল, তা নির্ভরযোগ্যভাবে শনাক্ত করা কঠিন।
যেভাবে প্রতারণা করা হয়
প্রতারকেরা প্রথমে সাধারণত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও, অডিও, পডকাস্ট কিংবা অন্যান্য উৎস থেকে নির্দিষ্ট ব্যক্তির কণ্ঠস্বরের নমুনা সংগ্রহ করে। কখনো কখনো প্রতারণামূলক ফোনকলের সময় গোপনে কথোপকথন ধারণ করেও কণ্ঠস্বর সংগ্রহ করা হয়। পরে এআই প্রযুক্তির সাহায্যে সেই কণ্ঠস্বরের নকল তৈরি করে প্রতারকেরা।
একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে ব্যক্তির পরিবার, বন্ধু ও পরিচিতজনদের সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এসব তথ্য ব্যবহার করে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করা হয়, যা ভুক্তভোগীর কাছে বাস্তব বলে মনে হয়।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রতারকেরা দাবি করে, পরিবারের কোনো সদস্য অপহরণের শিকার হয়েছেন, দুর্ঘটনায় পড়েছেন বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে রয়েছেন। এরপর দ্রুত অর্থ পাঠানোর জন্য চাপ দেওয়া হয়, যাতে ভুক্তভোগী পরিস্থিতি যাচাই করার সুযোগ না পান।
ফিলাডেলফিয়ার আইনজীবী গ্যারি শিল্ডহর্ন একবার তাঁর ছেলের কণ্ঠস্বর নকল করে পরিচালিত একটি প্রতারণার লক্ষ্যবস্তু হয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘চিন্তা করার মতো কোনো সময়ই ছিল না। তখন আমার মাথায় শুধু একটি চিন্তাই কাজ করছিল, ছেলেকে সাহায্য করতে হবে। সে বিপদে আছে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু ক্ষেত্রে প্রতারণা শুধু আগে থেকে তৈরি করা অডিও বার্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে প্রতারকেরা নিজেদের কণ্ঠস্বরও তাৎক্ষণিকভাবে পরিবর্তন করতে পারে। ফলে সরাসরি কথোপকথনের সময়ও তারা নিজেদের কণ্ঠস্বর অন্য কারও মতো করে শোনাতে সক্ষম হয়। এতে প্রতারণার বিশ্বাসযোগ্যতা আরও বেড়ে যায়। এ ছাড়া ‘কলার আইডি স্পুফিং’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ফোন নম্বরও জাল করা সম্ভব। ফলে ফোনটি পরিচিত কোনো নম্বর থেকে এসেছে বলে মনে হলেও সেটি প্রকৃতপক্ষে প্রতারকের নম্বর হতে পারে।
নিরাপদ থাকতে যা করবেন
একসময় কথার মাঝখানে অস্বাভাবিক বিরতি, যান্ত্রিক শব্দ বা কণ্ঠস্বরের অস্বাভাবিক ওঠানামাকে এআই দিয়ে তৈরি কণ্ঠস্বর শনাক্ত করার লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তবে এখন এসব সংকেত অনেক ক্ষেত্রেই আর দেখা যায় না। তাই বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, কণ্ঠস্বরটি আসল না নকল, সেটি বোঝার চেষ্টা করার চেয়ে পরিস্থিতির অন্যান্য দিক বিশ্লেষণ করা বেশি কার্যকর। যেমন ফোনের অপর প্রান্তের ব্যক্তি কি দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে চাপ দিচ্ছেন? তিনি কি বিষয়টি কাউকে না জানাতে বলছেন? অথবা অস্বাভাবিক কোনো উপায়ে অর্থ পাঠানোর অনুরোধ করছেন? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে প্রতারণার লক্ষণ শনাক্ত করা সহজ হতে পারে।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও সাইবার নিরাপত্তাবিষয়ক প্রতিষ্ঠান গেটরিয়াল সিকিউরিটির প্রধান বিজ্ঞান কর্মকর্তা হ্যানি ফারিদ জানিয়েছেন, এ ধরনের ফোনকল পেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে অন্য কোনো মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করা উচিত। খুদে বার্তা পাঠানো, অন্য নম্বরে ফোন করা কিংবা তার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে জানেন, এমন কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা পরিবার, বন্ধু বা সহকর্মীদের মধ্যে একটি গোপন ‘কোড ওয়ার্ড’ বা সংকেত শব্দ নির্ধারণেরও পরামর্শ দিয়েছেন। এমন কোনো শব্দ বা বাক্যাংশ বেছে নেওয়া উচিত, যা কেবল নির্দিষ্ট কয়েকজন জানেন এবং অনলাইনে খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। এ ছাড়া কোনো ফোনকল সন্দেহজনক মনে হলে সেটি যাচাই করতে কয়েক মিনিট সময় নিতে হবে। কারণ, সামান্য সতর্কতা অনেক সময় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে পারে। পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনলেই সেটি সত্যি বলে ধরে নেওয়ার দিন দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। তাই ডিজিটাল যুগে নিরাপদ থাকতে সচেতনতা ও যাচাই–বাছাইয়ের বিকল্প নেই।
সূত্র: সিএনএন