ওপেনএআই নিয়ে মাস্কের নতুন অভিযোগ, চ্যাটজিপিটির সঙ্গে আত্মহত্যার ঘটনার যোগসূত্র আছে

ইলন মাস্কফাইল ছবি: রয়টার্স

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান ওপেনএআইকে ঘিরে সহপ্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ক ও বর্তমান প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যানের দীর্ঘদিনের বিরোধ নতুন করে সামনে এসেছে। সম্প্রতি আদালতে দাখিল করা এক ভিডিও জবানবন্দিতে মাস্ক দাবি করেন, ওপেনএআইয়ের চ্যাটবট চ্যাটজিপিটির সঙ্গে কিছু ব্যবহারকারীর আত্মহত্যার ঘটনার সম্পর্ক রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠানের চ্যাটবট গ্রোককে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ বলে উল্লেখ করেন।

প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম টেকক্রাঞ্চ জানিয়েছে, গত সেপ্টেম্বরে ধারণ করা এই জবানবন্দি চলতি সপ্তাহে আদালতে প্রকাশ্যে দাখিল করা হয়। আগামী মাসে সম্ভাব্য জুরি বিচার শুরুর আগে এটি মামলার নথিতে যুক্ত করা হয়েছে। ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে মাস্কের চলমান মামলার অংশ হিসেবেই এই সাক্ষ্য প্রদান করা হয়েছে। জবানবন্দিতে মাস্ক বলেন, গ্রোকের কারণে কেউ আত্মহত্যা করেনি। কিন্তু চ্যাটজিপিটির ক্ষেত্রে এমন অভিযোগ রয়েছে। ওপেনএআই বর্তমানে যেসব মামলার মুখোমুখি, তার কয়েকটিতে বাদীপক্ষ দাবি করেছে, চ্যাটজিপিটির প্রভাব বা অতিমাত্রায় আবেগঘন কথোপকথন ব্যবহারকারীদের গভীর মানসিক চাপে ফেলেছিল এবং কিছু ক্ষেত্রে তা আত্মহত্যার ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত। তবে এসব অভিযোগ এখনো বিচারাধীন। সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত রায় হয়নি।

মাস্কের অভিযোগের মূল কেন্দ্র ওপেনএআইয়ের কাঠামোগত পরিবর্তন। তাঁর দাবি, মানবকল্যাণে নিরাপদ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে যে অলাভজনক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ওপেনএআই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, পরবর্তীকালে তা মুনাফাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়। তাঁর মতে, এই পরিবর্তন প্রতিষ্ঠার সময়কার অঙ্গীকারের পরিপন্থী। জবানবন্দিতে তিনি বলেন, রাজস্ব বৃদ্ধি, দ্রুত সম্প্রসারণ ও কৌশলগত অংশীদারত্বের চাপ অনেক সময় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানকে নিরাপত্তার চেয়ে গতি অগ্রাধিকার দিতে প্ররোচিত করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো প্রভাবশালী প্রযুক্তির ক্ষেত্রে সতর্কতা, নৈতিক দায়বদ্ধতা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকির গভীর মূল্যায়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

২০২৩ সালের মার্চে প্রকাশিত এক খোলাচিঠির প্রসঙ্গও টানেন মাস্ক। এক হাজারের বেশি প্রযুক্তিবিদ ও গবেষকের সমর্থিত ওই চিঠিতে জিপিটি ৪–এর চেয়ে শক্তিশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাব্যবস্থা তৈরির কাজ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার আহ্বান জানানো হয়েছিল। সেখানে সতর্ক করা হয়, সম্ভাব্য ঝুঁকি পুরোপুরি অনুধাবন না করেই গবেষণাগারগুলো ক্রমেই অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যবস্থা তৈরির প্রতিযোগিতায় নেমেছে। কেন তিনি চিঠিতে সই করেছিলেন, এ প্রশ্নে মাস্ক বলেন, নিরাপত্তা ইস্যুতে বৈশ্বিক আলোচনা জরুরি বলেই তিনি এতে সমর্থন দেন।

ওপেনএআইয়ের নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুললেও মাস্কের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান এক্সএআইয়ের চ্যাটবট গ্রোকও সম্প্রতি বিতর্কের মুখে পড়ে। গত মাসে গ্রোকের মাধ্যমে তৈরি অননুমোদিত নগ্ন ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অভিযোগ ওঠে, কিছু ছবিতে নাবালকদের সম্পৃক্ততাও ছিল। এ ঘটনায় ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় তদন্ত শুরু করে। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। কয়েকটি দেশে সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপের খবরও প্রকাশিত হয়েছে।

মাস্ক ও ওপেনএআইয়ের দ্বন্দ্ব নতুন নয়। জবানবন্দিতে তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উন্নয়নে গুগলের সম্ভাব্য একচেটিয়া প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ থেকেই তিনি ওপেনএআই প্রতিষ্ঠায় যুক্ত হয়েছিলেন। গুগলের সহপ্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজের সঙ্গে তাঁর আলোচনাকে তিনি ‘উদ্বেগজনক’ বলে বর্ণনা করেন এবং দাবি করেন, সে সময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিরাপত্তা যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। ওপেনএআইকে তিনি সেই সম্ভাব্য ঝুঁকির ভারসাম্য রক্ষাকারী একটি উদ্যোগ হিসেবে দেখেছিলেন।

উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে মাস্ক ওপেনএআইয়ের পরিচালনা পর্ষদ থেকে সরে দাঁড়ান। সে সময় তিনি জানান, টেসলার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসংক্রান্ত কাজের সঙ্গে সম্ভাব্য স্বার্থসংঘাত তৈরি হচ্ছিল। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো নিয়েও তাঁর মতপার্থক্য ছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে