স্যামসাংয়ের দুই লাখ টাকার বেশি দামের পাসপোর্ট আকৃতির ভাঁজযোগ্য ফোন, কী আছে এতে
ভাঁজযোগ্য (ফোল্ডেবল) স্মার্টফোনের বাজারে শুরু থেকে পথ দেখাচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং। এর ধারাবাহিকতায় তারা এবার বাজারে এনেছে নতুন ভাঁজযোগ্য ফোন ‘গ্যালাক্সি জেড ফোল্ড ৮’। এত দিন স্যামসাং মূলত লম্বাটে ও সরু স্ক্রিনের ফোন তৈরি করে আসছিল। অনেকেই অসন্তুষ্ট হয়ে সেই আকৃতিকে ‘টিভি রিমোট’ বলতেন। এবার স্যামসাং সেই চেনা পথ পুরোপুরি বদলে ফেলেছে। সম্পূর্ণ নতুন এক ভাবনার ওপর ভিত্তি করে তারা তৈরি করেছে এই ফোন।
যেকোনো নতুন যন্ত্র হাতে পাওয়ার পর প্রথম কয়েক দিন ব্যবহারকারীর মনে একধরনের মুগ্ধতা কাজ করে। প্রযুক্তি–বিশ্লেষকদের ভাষায় এটি ‘হানিমুন ফেজ’ বা ‘মুগ্ধতার সোনালি সময়’। এ সময় ফোনের সব ফিচারই দারুণ মনে হয়। তবে সপ্তাহখানেক নিবিড়ভাবে ব্যবহারের পরই প্রকাশ পেতে থাকে আসল রূপ।
আইফোন আলট্রার বিরুদ্ধে স্যামসাংয়ের চাল
স্যামসাং কেন ফোল্ড ৮-এর জন্য এই নতুন পাসপোর্টের মতো গড়ন বেছে নিল? জরিপের তথ্য তুলে ধরে ফোনঅ্যারেনা জানায়, প্রায় ৫২ শতাংশ পাঠক মনে করেন, স্যামসাং এই নকশার মাধ্যমে মূলত অ্যাপলের বহুল প্রতীক্ষিত আইফোন আলট্রার বিরুদ্ধে একটি আগাম প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চেয়েছে। কাগজে-কলমে অ্যাপল প্রথমে এই ধরনের নকশা নিয়ে কাজ করলেও স্যামসাং তাদের আগেই বাজারে ফোনটি নিয়ে এসেছে। নতুন এই পাসপোর্টের মতো আকৃতি বাজারে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। ফলে নতুন এই মডেলের আগাম চাহিদা জানানো আগের মডেলের চেয়ে প্রায় তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে আইফোন আলট্রার বাজারে আসার বিষয়ে এখনো আ্যাপল আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলেনি।
১৯০০ ডলার বা প্রায় ২ লাখ ৩৪ হাজার টাকার এই ফোনের গড়ন পাসপোর্টের মতো। স্ক্রলিং ও পড়ার জন্য দারুণ উপযোগী। ভাঁজ করা অবস্থায় ফোনটি মাত্র ৯ দশমিক ৭ মিলিমিটার পাতলা। এর ওজন মাত্র ২০১ গ্রাম।
নকশায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন
নকশার দিক থেকে গ্যালাক্সি জেড ফোল্ড ৮-এ এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। ফোনটি হাতে নিলেই প্রথম যে বিষয় চোখে পড়ে, তা হলো এর স্লিম বা পাতলা অবয়ব। ফোনটি আগের চেয়ে অনেক হালকা এবং এর কোনাগুলো কিছুটা চারকোনা করে নকশা করা হয়েছে, যা একে একটি আধুনিক চেহারা দেয়।
ফোনটি যখন বন্ধ থাকে, তখন এর বাইরের ডিসপ্লে হিসেবে কাজ করে ৫ দশমিক ৫ ইঞ্চির একটি অ্যামোলেড স্ক্রিন। এটি চওড়া হওয়ায় সাধারণ স্মার্টফোনের মতোই এক হাতে খুব সহজে ব্যবহার করা যায়, যা আগের ভাঁজযোগ্য (ফোল্ডেবল) স্মার্টফোনগুলোয় বেশ কঠিন ছিল।
এই চওড়া আকৃতির প্রশংসা করে জনপ্রিয় মার্কিন প্রযুক্তি ওয়েবসাইট সিনেট জানায়, ১৯০০ ডলার বা প্রায় ২ লাখ ৩৪ হাজার টাকার এই ফোনের গড়ন পাসপোর্টের মতো। স্ক্রলিং ও পড়ার জন্য দারুণ উপযোগী। ভাঁজ করা অবস্থায় ফোনটি মাত্র ৯ দশমিক ৭ মিলিমিটার পাতলা। এর ওজন মাত্র ২০১ গ্রাম। আর্মার অ্যালুমিনিয়াম ও টাইটানিয়ামের সমন্বয়ে তৈরি কাঠামো ফোনটিকে হাত থেকে পড়ে যাওয়া বা আকস্মিক আঘাত থেকে দারুণ সুরক্ষা দেয়।
এক হাতে ব্যবহারের প্রতিবন্ধকতা
তবে এই নতুন গড়ন নিয়ে যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের পর্যবেক্ষণ কিছুটা ভিন্ন। সংবাদমাধ্যমটি জানায়, খাটো ও চওড়া আকৃতির কারণে ফোনটি হাতে নিলে একটি ছোট নোটপ্যাড মনে হলেও এটি সাধারণ ফোন ব্যবহারের অভিজ্ঞতাকে কিছুটা ব্যাহত করে। গার্ডিয়ানের কনজ্যুমার টেকনোলজি এডিটর স্যামুয়েল গিবস বলেন, অতিরিক্ত চওড়া হওয়ার কারণে ফোনটি এক হাতে ব্যবহার করা প্রায় অসম্ভব। ফলে বেশির ভাগ সময়েই বার্তা টাইপ করা বা স্ক্রল করার জন্য ব্যবহারকারীকে দুই হাত ব্যবহার করতে হয়।
গিবস আরও একটি বড় নকশাগত ত্রুটির কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি জানান, ৫ দশমিক ৫ ইঞ্চির বাইরের পর্দাটিতে যখন কি–বোর্ড খোলা হয়, তখন তা পর্দার অর্ধেকের বেশি জায়গা দখল করে নেয়। ফলে বার্তা লেখার সময় কী লেখা হচ্ছে, তা দেখার জন্য খুব সামান্য জায়গাই খালি থাকে। এটি দৈনন্দিন বার্তা পাঠানোর সময় বেশ বিরক্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করে।
স্যামসাং গ্যালাক্সি জেড ফোল্ড ৮ গত ২২ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচন করা হয় এবং বাজারজাতকরণ শুরু হয় ৭ আগস্ট।
টাইটানিয়াম কবজা
ফোনটি মেললেই চোখে পড়ে ৪:৩ অনুপাতের ৭ দশমিক ৬ ইঞ্চির বড় পর্দা। এটা দেখতে অনেকটা আইপ্যাড মিনির মতো। খ্যাতনামা টেক ইউটিউবার মার্কেস ব্রাউনলি বলেন, এর পর্দাটি অত্যন্ত উজ্জ্বল। আলোপ্রতিরোধী প্রলেপ থাকায় রোদের মধ্যেও সহজে পর্দা দেখা যায়। চওড়া এই পর্দায় পড়া ও লেখালেখির কাজে বাড়তি সুবিধা দেয় স্যামসাংয়ের গ্যালাক্সি এআই।
মার্কেসের মতে, স্যামসাংয়ের নতুন ‘টাইটানিয়াম ফ্লেক্স হিঞ্জ’ বা কবজাটি পর্দার মাঝখানের ভাঁজ আড়াল করতে বেশ কার্যকর। তবে একটি বড় যন্ত্রাংশজনিত কমতিও তিনি তুলে ধরেছেন। ফোনটিতে কোনো ‘ফ্লেক্স মোড’ বা অর্ধেক ভাঁজ করে রাখার সুবিধা নেই। এর স্প্রিংযুক্ত কবজাটি ফোনটিকে হয় পুরোপুরি বন্ধ, নয়তো পুরোপুরি খোলা রাখতে বাধ্য করে। ফলে টেবিলের ওপর ল্যাপটপের মতো করে এটি ব্যবহারের সুযোগ নেই।
নামকরণের বিভ্রান্তি
ডিজাইনের পাশাপাশি গ্যালাক্সি জেড ফোল্ড ৮-এর নামকরণ নিয়েও ক্রেতাদের মধ্যে কিছুটা বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। জিএসএমঅ্যারেনা জানায়, একদম নতুন ধরনের এই চওড়া ভাঁজযোগ্য স্মার্টফোনটির নাম স্যামসাং রেখেছে গ্যালাক্সি জেড ফোল্ড ৮। অন্যদিকে গত বছরের অপেক্ষাকৃত সরু গড়নের ফোল্ড ৭-এর প্রকৃত উত্তরসূরি হিসেবে বাজারে এসেছে ‘জেড ফোল্ড ৮ আলট্রা’। জিএসএমঅ্যারেনা মনে করে, স্যামসাংয়ের এই নামকরণ কিছুটা বিভ্রান্তিকর হলেও সাধারণ সচেতন ক্রেতারা ভুল করে অন্য ফোন কিনে ফেলবেন না। তবে টাকা খরচ করে কেনার আগে এই পার্থক্য ভালো করে জেনে নেওয়া জরুরি।
কার্যক্ষমতা
ফোনটির গতি বাড়াতে স্যামসাং এতে কোয়ালকমের নতুন ‘স্ন্যাপড্রাগন ৮ এলিট জেন ৫’ প্রসেসর ব্যবহার করেছে। দ্য গার্ডিয়ান জানায়, এই চিপ অত্যন্ত শক্তিশালী কাজ করতে সক্ষম। ভারী গেম খেলা ও মাল্টিটাস্কিংয়ের জন্য এটি বর্তমানে অন্যতম দ্রুতগতির অ্যান্ড্রয়েড ফোন। ব্যবহারকারীরা বড় ভেতরের পর্দায় অনায়াসেই পাশাপাশি তিনটি অ্যাপ চালাতে পারবেন। এ ছাড়া স্যামসাং এই ফোনে ২০৩৩ সাল পর্যন্ত সাত বছরের সফটওয়্যার ও নিরাপত্তা হালনাগাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
স্যামসাং তাদের ব্যাটারি প্রযুক্তিতেও বড় ধরনের উন্নতি এনেছে। সিলিকন কার্বন প্রযুক্তির সুবাদে স্যামসাং এত পাতলা ফোনেও ৪৮০০ মিলিঅ্যাম্পিয়ারের বড় ব্যাটারি যুক্ত করতে পেরেছে। দ্য গার্ডিয়ানের পরীক্ষা অনুযায়ী, সাধারণ ব্যবহারে এই ফোন টানা ৪০ ঘণ্টা ব্যাকআপ দেয়। ৪৫ ওয়াটের চার্জার দিয়ে ফোনটি মাত্র ৬৫ মিনিটে পুরো চার্জ হয়ে যায়। এ ছাড়া এটি ২০ ওয়াটের ওয়্যারলেস চার্জিংও সমর্থন করে।
হানিমুন পর্ব শেষে
মুগ্ধতার প্রথম পর্ব শেষ হওয়ার পরই মূলত ফোনটির কিছু বড় যন্ত্রাংশজনিত সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। প্রথম সমস্যাটি স্পিকারের গঠনে। মার্কেস ব্রাউনলির মতে, ফোনটি বন্ধ থাকলে স্পিকার দুটি চমৎকার স্টেরিও সাউন্ড দেয়। কিন্তু খোলার পর দুটি স্পিকারই স্ক্রিনের বাঁ পাশে চলে যায়। এতে আড়াআড়িভাবে ভিডিও বা সিনেমা দেখার সময় শব্দ কেবল এক পাশ থেকে আসে এবং শব্দের ভারসাম্য ব্যাহত হয়।
দ্বিতীয় বড় আপসটি করতে হয়েছে ক্যামেরার ক্ষেত্রে। মার্কেস তাঁর ভিডিওতে জানান, পাতলা গড়নের কারণে এই ফোনে স্যামসাং কোনো ডেডিকেটেড টেলিফটো লেন্স রাখেনি। পেছনের ক্যামেরার জন্য এতে কেবল ৫০ মেগাপিক্সেলের প্রাইমারি ও ৫০ মেগাপিক্সেলের আলট্রা-ওয়াইড লেন্স ব্যবহার করা হয়েছে। দ্য গার্ডিয়ানও ক্যামেরার এই খামতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছে। সংবাদমাধ্যমটি জানায়, এই দামের ফোনের তুলনায় ক্যামেরাটি অত্যন্ত সাধারণ মানের। কম আলোতে ছবির তীক্ষ্ণতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায় এবং ডিজিটাল জুম ২ গুণের বেশি বাড়ালে ছবির মান নষ্ট হতে শুরু করে।
এ ছাড়া ফোনটিতে কোনো বিল্ট-ইন ম্যাগনেট বা চৌম্বক–সুবিধা দেওয়া হয়নি। ফলে যেকোনো তারহীন চার্জিং স্ট্যান্ডে ফোনটি বসানো বেশ ঝামেলার কাজ। বিশেষ করে গাড়ির তারহীন চার্জারগুলোয় এই ফোন সহজে বসানো যায় না। টেবিলের ওপর ফোনটি রাখলে পেছনের ক্যামেরা বাম্পের কারণে এটি সমান্তরালভাবে বসে না; বরং স্পর্শ করলেই দুলতে থাকে।