সাইবার নিরাপত্তা খাতে চাকরি, চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ
বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী প্রায় ১৩ কোটি ২০ লাখ লোক ইন্টারনেট ব্যবহার করে, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকেরও বেশি। ডিজিটাল লেনদেন, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস এবং অনলাইন শিক্ষাকাজের বিস্তার দেশের ডিজিটাল উপস্থিতি শক্তিশালী করেছে। তবে এর সঙ্গে সঙ্গে সাইবার হুমকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশে ডিজিটাল প্রযুক্তি এখন জীবনের অপরিহার্য অংশ। অনলাইন ব্যাংকিং, মোবাইল ফিন্যান্স, ই-গভর্ন্যান্স সেবা থেকে শুরু করে শিক্ষাকাজ—সবকিছু এখন ইন্টারনেটের মাধ্যমে। কিন্তু এই ‘ডিজিটাল দেশ’ দ্রুত এগোলে কোথাও কোথাও নিরাপত্তা ও প্রস্তুতির দূরত্বও বেড়ে যাচ্ছে। এই বাস্তবতার মাঝে তরুণেরা উপলব্ধি করছে সাইবার নিরাপত্তা ক্যারিয়ারকে শুধু একটি চাকরি নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার একটি অনুষঙ্গ হিসেবে।
ডিজিটাল ঝুঁকি ও হুমকির পরিসংখ্যান
বাংলাদেশে সাইবার অপরাধের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, গত এক বছরে সাইবার অপরাধ বেড়েছে ১১ দশমিক ৮৫ শতাংশ, যার মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন অ্যাকাউন্ট হ্যাকিংয়ের শীর্ষ অংশ ছিল। ভুক্তভোগীদের মধ্যে তরুণেরা (১৮-৩০ বছর বয়সী) বেশি, ৭৮ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
গত ৫ বছরে ১ লাখ ৮০ হাজারেরও বেশি সাইবার–সংক্রান্ত অভিযোগ গ্রাহকেরা দাখিল করেছেন, প্রায় ৮০ শতাংশ অভিযোগকারীও ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী। হ্যাকিং, অর্থ লুণ্ঠন, ব্যাংকিং ও মোবাইল ফিন্যান্স পরিষেবায় প্রতারণা, ই-কমার্স প্রতারণা ইত্যাদি শাখায় হাজার হাজার মামলা তদন্তাধীন রয়েছে।
এই সংখ্যা শুধু পাথেয় না, এটি কর্মক্ষেত্রে যত দ্রুত দক্ষ নিরাপত্তা ব্যক্তির প্রয়োজন তত দ্রুত তা তৈরি হচ্ছে না তারই প্রমাণ।
এখন ও আগামী দিনের চাকরির চাহিদা
সাইবার নিরাপত্তা আজ তথ্যপ্রযুক্তি খাতে একদম ‘হট সেক্টর’। কারণ, সাইবার সিকিউরিটি পেশাজীবীদের জন্য শূন্য বেকারত্বের হারের মতো বাজার—এই ক্ষেত্রের চাকরি প্রায় সব সময় ভরা থাকে। দক্ষতা থাকলে বিশ্বব্যাপী চাকরির সুযোগ—অনেক বাংলাদেশি দূর থেকে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সাইবার নিরাপত্তা কাজ করছে।
বিভিন্ন চাকরির চাহিদা বাড়ছে। এর মধ্যে নিরাপত্তা বিশ্লেষক, নেটওয়ার্ক নিরাপত্তা প্রকৌশলী, পেনিট্রেশন টেস্টার ও ক্লাউড নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের চাহিদা আছে। বিশ্বব্যাপী তথ্য নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের চাকরির চাহিদা ২০২৮ সাল নাগাদ ৩২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে, যা অন্যান্য পেশার তুলনায় অনেক দ্রুত।
বেতন ও ক্যারিয়ার প্রবৃদ্ধি
ডেটা বলে, বাংলাদেশে সাইবার নিরাপত্তা পেশার বেতন বাজার ধীরে ধীরে প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠছে।
* এন্ট্রি লেভেল: মাসিক প্রায় ৩০ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকা
* মিড লেভেল: মাসিক প্রায় ৬০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা
* জ্যেষ্ঠ পদ: মাসিক প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা থেকে ৫ লাখ টাকা
* নির্দিষ্ট কিছু বিশেষ পদ, যেমন এথিক্যাল হ্যাকার বা সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক মাসিক প্রায় ৬৬ হাজার বা তার বেশি আয় করা সম্ভব।
এই বেতনপ্রবণতা তরুণদের জন্য বড় আকর্ষণ। তা ছাড়া আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর রিমোট জব সুযোগ আরও আয়ের সুযোগ খুলে দেয়।
বাস্তব সমস্যা: দক্ষতার ঘাটতি
তবে এই বাজারের বড় সমস্যা হচ্ছে দক্ষ মানুষের অভাব। বেসরকারি সংস্থাগুলোর প্রশিক্ষণ ও সরকারি উদ্যোগের প্রচেষ্টা থাকলেও, মূলত অনেক প্রতিষ্ঠান যথাযথ নিরাপত্তা প্রটোকল ও প্রস্তুতি গ্রহণে ধীর আচরণ করে। প্রশিক্ষণ ও সার্টিফিকেশন সম্পন্ন তরুণদের চাকরিতে যুক্ত হওয়ার পথ এখনো বাধাগ্রস্ত। অনেক ক্ষেত্রে তরুণেরা বিদেশি চাকরির জন্য প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। এ ছাড়া সাধারণ জনগণের মধ্যে অনেকেই সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন নন—ফলে তরুণেরা দক্ষ হলেও পরিবেশে অপর্যাপ্ত গ্রহণযোগ্যতা দেখা দেয়।
সুযোগ ও প্রস্তুতির রাস্তা
সাইবার নিরাপত্তা শুধু একটি চাকরি নয়; এটি টেক শহর ও ডিজিটাল অর্থনীতির অপরিহার্য শাখা। তরুণদের জন্য এটি একটি শক্তিশালী ক্যারিয়ারের পথ হিসেবে দাঁড়াতে পারে, যদি তারা সিইএইচ, সিআইএসএসপি, কম্প–টিআইএ সিকিউরিটি সনদ অর্জন করে। বাস্তব প্রকল্পে এবং পরীক্ষামূলক কাজে অভিজ্ঞ হয়েও এই পেশায় আসা যায়।
ঢাকায় বসে একটি স্টার্টআপ থেকে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান—সব জায়গায় সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু চ্যালেঞ্জও কম নয়—দক্ষতার ঘাটতি, প্রশিক্ষণের অভাব ও নিরাপত্তা সচেতনতার দুর্বলতা। তরুণেরা যদি সঠিক দক্ষতা ও প্রস্তুতি নিয়ে এগোতে পারে, তাহলে এটা শুধু একটি চাকরি নয়—এটা দেশের ডিজিটাল ভবিষ্যৎ গঠনেও ভূমিকা রাখতে পারে।
তৌহিদ ভূঁইয়া: তথ্যপ্রযুক্তিবিদ ও ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির অধ্যাপক