ডিপফেক ভিডিও যেভাবে এল
প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের তৈরি আধেয় বা কনটেন্ট এবং সত্যের মধ্যকার ব্যবধান দিন দিন কমে আসছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের কারণে তৈরি হচ্ছে নিখুঁত সব ডিপফেক ছবি, ভিডিও ও অডিও দেখা যাচ্ছে। বর্তমান বিশ্বে এই প্রযুক্তি অপরাধ, পর্নোগ্রাফি এবং রাজনৈতিক প্রচারণায় গুরুতর সংকট তৈরি করেছে। সম্প্রতি বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের একটি প্রামাণ্যচিত্রে ডিপফেক প্রযুক্তির উত্থান ও এর নেতিবাচক প্রভাব বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
১৯৮৭ সালে ফটোভিত্তিক সম্পাদনার সফটওয়্যার ফটোশপের মাধ্যমে ডিজিটাল জালিয়াতির সূচনা হয়েছিল। কম্পিউটারবিজ্ঞানী জন নোল তাঁর তৎকালীন বান্ধবী জেনিফারের একটি ছবির ওপর সম্পাদনা করে বিশ্বের প্রথম ডিজিটাল ক্লোন তৈরি করেন। তখন ডেস্কটপ কম্পিউটারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের নাগালে ছবি হেরফের করার প্রযুক্তি চলে আসে। ইন্টারনেটের শুরুর দিকে তারকাদের সম্পাদিত ছবি ওয়েবসাইটে ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা দেখা দেয়। এড লেক নামক এক ব্যক্তি প্রথম এই জালিয়াতি ধরতে কাজ শুরু করেন। কানের দুলের কোণ বা ছবির আলোর তারতম্য দেখে তিনি ভুয়া ছবি শনাক্ত করতেন।
পরবর্তী সময়ে ২০১৪ সালে সফটওয়্যার প্রকৌশলী ইয়ান গুডফেলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জগতে বিপ্লব ঘটান। মন্ট্রিলে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডার সময় তিনি জেনারেটিভ অ্যাডভার্সারিয়াল নেটওয়ার্ক তৈরি করেন। এই পদ্ধতিতে দুটি এআই নেটওয়ার্ক পরস্পরের বিরুদ্ধে কাজ করে। প্রথম নেটওয়ার্ক ছবি তৈরি করে এবং দ্বিতীয় নেটওয়ার্ক তাতে ভুল খুঁজে বের করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ব্যবস্থা অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও উচ্চ রেজোল্যুশনের ছবি তৈরি করতে সক্ষম হয়।
বিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিপ্লব ঘটাতে এই প্রযুক্তি তৈরি হলেও তা অপরাধের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। প্রযুক্তি সাংবাদিক সামান্থা কোল জানান, অল্প সময়ের মধ্যে মানুষের মুখে অন্য কারও শরীর বসানোর প্রযুক্তি চলে আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রেডিটের এক ব্যবহারকারী ইয়ান গুডফেলোর কাজকে এগিয়ে নিয়ে ভিডিওতে মানুষের মুখ বসানোর কৌশল আবিষ্কার করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রযুক্তি আরও সহজ হয়ে ওঠে। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি সাধারণ টুইট বা প্রম্পটের মাধ্যমে পর্নোগ্রাফিক বা আপত্তিকর ডিপফেক ছবি তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে।
জাপানি-ব্রাজিলীয় সাংবাদিক ও গায়িকা জুলি ইউকুরি এআই ডিপফেকের শিকার হয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর একটি সাধারণ ছবির ওপর ভিত্তি করে গ্রোক এআই ব্যবহার করে আপত্তিকর ছবি তৈরি করা হয়। এই ঘটনার পর তাঁর জীবনে মারাত্মক মানসিক প্রভাব পড়ে। নিউইয়র্ক টাইমসের এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মাত্র নয় দিনে গ্রোক এআই প্রায় ১৮ লাখ যৌনতাপূর্ণ ছবি তৈরি করেছে।
বিশ্বজুড়ে এখন ২০০ কোটি ডলারের সমান অর্থমূল্যে বছরে ডিপফেক নির্ভর প্রতারণা হচ্ছে বলে মনে করা হয়। পর্নোগ্রাফির গণ্ডি পেরিয়ে ডিপফেক এখন বিশ্বরাজনীতির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২২ সালে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির একটি ভুয়া ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। সেই ভিডিওতে তাঁকে ইউক্রেনীয় সৈন্যদের কাছে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানাতে দেখা যায়। যদিও বড় মাথা এবং নিচু কণ্ঠস্বর দেখে সেটি যে ভুয়া তা সহজেই বোঝা গিয়েছিল। ২০২৪ সালে ভারতে বলিউড তারকাদের রাজনৈতিক প্রচারণার ভুয়া ভিডিও ছড়ায়। মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নিয়ে ডিপফেক ভিডিও তৈরির ঘটনা ঘটে।
বিভিন্ন দেশের সরকার এই জালিয়াতি রোধে কঠোর আইন প্রণয়ন করছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশ কয়েকটি দেশে অন্তরঙ্গ ডিপফেক ছবি তৈরি ও ছড়ানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইনে এই ধরনের কনটেন্ট স্পষ্টভাবে লেবেল করার নিয়ম রাখা হয়েছে। ইলন মাস্কের মতো প্রযুক্তি উদ্যোক্তারা প্রাথমিকভাবে সমস্যাটি এড়িয়ে গেলেও জনরোষের মুখে এক্স প্ল্যাটফর্মে কড়াকড়ি আরোপ করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে ডিপফেকের যুগে বেঁচে থাকতে হলে সাধারণ মানুষকে আরও বেশি সতর্ক হতে হবে। ভিডিও দেখার সময় আগের সময়ের মতো মানুষের সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা বাড়াতে হবে। ছবির বাইরে গিয়ে ভিডিওর উৎস ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলতে হবে। কোনো ছবি বা তথ্য সম্পূর্ণ নিশ্চিত না হয়ে তা বিশ্বাস বা শেয়ার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
সূত্র: বিবিসি