পিএইচপির মতো আরও ঝুঁকি ভবিষ্যতে আসতে পারে, কী ভাবছেন দেশি বিশেষজ্ঞরা

বিজিডি ই-গভ সার্টের ২০২২ সালের এক প্রতিবেদনে দেশের বিভিন্ন খাত লক্ষ্য করে সাইবার হামলা শনাক্তের কথা বলা হয়প্রতীকী ছবি: রয়টার্স

পিএইচপি হলো বিশ্বের অন্যতম বহুল ব্যবহৃত সার্ভার–সাইড স্ক্রিপ্টিং ল্যাঙ্গুয়েজ, যা ইন্টারনেটের সিংহভাগ ওয়েবসাইটের ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে কাজ করে। সম্প্রতি পিএইচপিতে সন্ধান পাওয়া ভয়াবহ নিরাপত্তা ত্রুটি গোটা তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্বকে নতুন করে শঙ্কার মুখে ফেলেছে। আবিষ্কৃত এই নিরাপত্তা ত্রুটি খুবই ভয়ংকর হতে পারে জানিয়েছেন পিএইচপি প্রোগ্রামার মোহাম্মদ ইমরান।

মোহাম্মদ ইমরানের মতে, কোনো অভিজ্ঞ হ্যাকার যদি সঠিকভাবে এই ত্রুটি ব্যবহার করতে পারে, তবে সে পুরো ওয়েব সার্ভারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে। যখন কোনো হ্যাকার ওয়েব সার্ভারের রুট অ্যাকসেস বা প্রশাসনিক ক্ষমতা পেয়ে যায়, তখন সে সহজেই সাইটের মূল ফাইল পরিবর্তন করার পাশাপাশি রিমোট কোড এক্সিকিউশন, তথ্যভান্ডার থেকে সংবেদনশীল গ্রাহকদের তথ্য বা অর্থসংক্রান্ত তথ্য চুরি এবং সম্পূর্ণ সার্ভিস অচল করে দেওয়ার মতো ভয়াবহ সাইবার হামলা চালাতে পারে। এমনকি আক্রান্ত সার্ভারটিকে ব্যবহার করে অন্যান্য নেটওয়ার্ক ও অবকাঠামোতেও ক্ষতিকর বটনেট হামলা চালানো সম্ভব, যা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক ক্ষতি ও ভাবমূর্তি ধ্বংসের পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তাকেও ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

পিএইচপিতে সন্ধান পাওয়া নিরাপত্তা ত্রুটির বিষয়ে ইন্টারনেট বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির বলেন, ত্রুটিটি কোনো সাধারণ কারিগরি ভুল ছিল না, দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে তা পিএইচপির কোডের গভীরে লুকিয়ে ছিল। দীর্ঘ সময় ধরে অসংখ্য নিরাপত্তা গবেষক ও ডেভেলপার পিএইচপি নিয়ে কাজ করলেও সবার চোখ এড়িয়ে যাওয়া ত্রুটিটি শেষ পর্যন্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সহায়তায় উন্মোচিত হয়েছে। এ ঘটনা প্রমাণ করে, ‘আমরা প্রতিদিন যেসব জনপ্রিয় সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার ব্যবহার করছি, তার ভেতরে এমন অনেক মারাত্মক নিরাপত্তাঝুঁকি রয়ে গেছে, যা মানুষ শনাক্ত করতে ব্যর্থ হলেও ভবিষ্যতে এআই তা খুঁজে পেতে পারে। এটি সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক নতুন যুগের সূচনা করার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির নিরাপত্তা নিয়ে নতুন চিন্তার খোরাক জোগায়।’

আরও পড়ুন

সুমন আহমেদ সাবির আরও বলেন, সফটওয়্যারে ত্রুটি বা হ্যাকিং নতুন কিছু নয়, তবে এবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে দীর্ঘ ১৪ বছরের পুরোনো ত্রুটি খুঁজে বের করার বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা ও নজিরবিহীন। এর মানে হলো, ‘আমরা যেসব বাণিজ্যিক প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানের সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যারের ওপর নির্ভর করছি, সেগুলোয় এখনো অসংখ্য অজানা ঝুঁকি রয়ে গেছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবিলম্বে তাদের কোড ও অবকাঠামো আধুনিক এআই প্রযুক্তির সাহায্যে পর্যালোচনা করতে হবে। পাশাপাশি সাধারণ ব্যবহারকারী ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষা নিয়ে ভাবতে হবে। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অবকাঠামো ও স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে যেকোনো সফটওয়্যার বা ফ্রেমওয়ার্ক ব্যবহার করার সময় সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ বজায় রাখা জরুরি। নিয়মিত সফটওয়্যার প্যাচ ও নিরাপত্তা আপডেট দেওয়া হচ্ছে কি না এবং যথাযথ মনিটরিং নিশ্চিত করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে এখনই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার সময় এসেছে।’

আরও পড়ুন

পিএইচপির ত্রুটির কারণে সম্ভাব্য সাইবার হামলা থেকে সুরক্ষা পেতে দ্রুত ও সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা গ্রহণের তাগিদ দিয়েছেন মোহাম্মদ ইমরান। তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানে আমরা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নিরাপত্তা প্যাচ ও সংস্করণ হালনাগাদ করে ফেলেছি। এটাই সবচেয়ে কার্যকর সমাধান। সাইবার হামলা রোধে পিএইচপির সর্বশেষ নিরাপদ সংস্করণটি দ্রুত সার্ভারে হালনাগাদ করতে হবে। এর পাশাপাশি সার্ভারে ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন ফায়ারওয়াল ব্যবহার, অপ্রয়োজনীয় পিএইচপি ফাংশন ও এক্সটেনশন বন্ধ, জিরো–ট্রাস্ট সিকিউরিটি মডেল অনুসরণ করার পাশাপাশি এআইভিত্তিক আধুনিক ভালনারেবিলিটি স্ক্যানার ব্যবহার করে নিয়মিত নিরাপত্তা পর্যালোচনা করতে হবে। প্রযুক্তিগত জটিলতা যতই বাড়ুক না কেন, সময়োপযোগী সচেতনতা, দ্রুত সিকিউরিটি আপডেট এবং উন্নত নিরাপত্তা নজরদারিই পারে একটি প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোকে এ ধরনের বিধ্বংসী সাইবার হামলা থেকে মুক্ত রাখতে।’