এক ইন্টারনেট তারকাই বিশ্বকাপ ফুটবলকে জেন-জিদের সামনে ছড়িয়ে দিয়েছেন
২১ বছর বয়সী ইন্টারনেট তারকা ড্যারেন ওয়াটকিন্স জুনিয়র, যিনি অনলাইন–জগতে আইশোসপড নামে পরিচিত, বর্তমান প্রজন্মের কাছে খেলাধুলার খবরের প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছেন। ঠিক যেভাবে আগের প্রজন্মের কাছে টিভি চ্যানেল ইএসপিএন ছিল অপরিহার্য, জেন-জি ও আলফা প্রজন্মের কাছে এখন ‘স্পিড’ বা আইশোস্পিড অনেকটা তেমনই এক একক ব্যক্তিচালিত মিডিয়া নেটওয়ার্ক।
চলতি ২০২৬ বিশ্বকাপকে ঘিরে স্পিডের উন্মাদনা এখন তুঙ্গে। বিশ্বকাপের আগে তিনি প্রকাশ করেছেন তাঁর গাওয়া গান ওয়ার্ল্ড কাপ, যেখানে তিনি ৪৮টি দেশের নাম উল্লেখ করেছেন। গানটি প্রকাশের ২৪ ঘণ্টার কম সময়ে ইউটিউবে ৭০ লাখের বেশি ভিউ পেয়েছে। ভক্তদের দাবির মুখে ফিফা শেষ পর্যন্ত তাঁর গানটিকে বিশ্বকাপের অফিশিয়াল অ্যালবামে যুক্ত করতে বাধ্য হয়েছে। ২০১৭ সালে কিশোর বয়সে ইউটিউবে যাত্রা শুরু করলেও ২০২০ সালের লকডাউনের সময় তিনি পুরোপুরি ‘স্ট্রিমার’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ভিডিও গেম ফিফা এবং এনবিএ টুকে খেলার মাধ্যমে জনপ্রিয়তা পেলেও কালক্রমে তিনি প্রথাগত স্ট্রিমারের গণ্ডি পেরিয়ে গেছেন। তাঁর বর্তমান ব্র্যান্ডিং তাঁর শোবার ঘরের চার দেয়াল থেকে বেরিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
স্পিড বলেন, ‘আমি শুধু ভিডিও গেমে আটকে থাকতে চাইনি। আমার লক্ষ্য হলো আমার প্রায় ৫৫ কোটি ৫০ লাখ সাবস্ক্রাইবারকে অনুপ্রাণিত করা।’ এই লক্ষ্য পূরণে তিনি ২০২৪ সাল থেকে বিভিন্ন দেশে ঘুরে ভ্রমণবিষয়ক কন্টেন্ট তৈরি করছেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় চিতার সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা থেকে শুরু করে ফিলিপাইনে ম্যানি প্যাকুইয়াওয়ের সঙ্গে বক্সিংয়ের মতো সবই তিনি সরাসরি সম্প্রচার করেছেন। ইন্দোনেশিয়ায় লাইভ স্ট্রিমিংয়ের সময় তিনি ১০ লাখ কনকারেন্ট ভিউয়ারের মাইলফলক স্পর্শ করেন, যা ইউটিউবে এক বিরল কৃতিত্ব। এমনকি গত বছর তিনি যুক্তরাষ্ট্রে এক মাসব্যাপী বিরতিহীন লাইভ স্ট্রিমিং ট্যুর করেছেন, যেখানে তিনি ঘুমানোর সময়ও ক্যামেরা বন্ধ রাখেননি।
খেলার দুনিয়ায় স্পিডের প্রভাব এখন অনস্বীকার্য। প্রচলিত টিভি চ্যানেলগুলোর জনপ্রিয়তা যখন কমছে, তখন স্পিড নিজেকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তুলেছেন। তাঁর শারীরিক সক্ষমতা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘প্রতি স্ট্রিমে আমি প্রায় ৩০০০ থেকে ৫০০০ ক্যালোরি খরচ করি। এটা শুধু স্ট্রিমিং নয়, এটি আমার কাছে একটি খেলা বা পারফরম্যান্সের মতো।’
বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে স্পিডের আবেগ ও দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট। তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবল খেলাকে জনপ্রিয় করতে এবারের বিশ্বকাপ দারুণ ভূমিকা রাখছে। বলেন, ‘আমি ইউরোপীয় ফুটবলের সৌন্দর্যে মুগ্ধ। ফুটবলের পুরো বিষয়টিই সুন্দর। আমেরিকায় অনেকেই একে অবমূল্যায়ন করে, আমি তাদের কাছে এই খেলার সৌন্দর্য তুলে ধরতে চাই।’ তাঁর লাইভ স্ট্রিমিংয়ের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা এবং বিশ্বব্যাপী মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে তিনি সব সময় আনন্দ এবং আত্মবিশ্বাসকে মূল বার্তা হিসেবে তুলে ধরেন। স্পিড জানান, ১৫ বছর বয়সে জীবনের কঠিন সময়ে তিনি যখন হতাশায় ভুগছিলেন, তখন অ্যানিমে ওয়ান পিসের প্রধান চরিত্র লুফি তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছিল। সেই অনুপ্রেরণাই তাঁকে আজ এ অবস্থানে নিয়ে এসেছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে স্পিড জানান, তিনি মহাকাশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন। ইলন মাস্কের প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ পেলে তিনি এখনই সব ছেড়ে মহাকাশ অভিযানে যেতে রাজি। এ ছাড়া বিভিন্ন সামাজিক বিষয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতেও তিনি পিছপা হন না। ফিলিস্তিনের পক্ষে সরাসরি কথা বলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি কেবল মানবিক অধিকারের বিষয় এবং তাঁর মুসলিম ভক্তদের প্রতি সহমর্মিতা থেকেই তিনি এ বিষয়ে সোচ্চার। এআই তাঁর জায়গা নিতে পারে কি না—এমন প্রশ্নের উত্তরে স্পিড বেশ আত্মবিশ্বাসী। তিনি বলেন, মানুষের সঙ্গে মানুষের যে জৈব সংযোগ, তা কোনো এআই প্রতিস্থাপন করতে পারবে না। প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, মানুষ সব সময় সেই আদিম মানবিক সংযোগই খুঁজবে।
স্পিড প্রমাণ করেছেন, প্রথাগত গণমাধ্যমের বাইরেও ইন্টারনেটের অসীম সম্ভাবনায় একজন একক ব্যক্তি কীভাবে গোটা বিশ্বের মনোযোগ কাড়তে পারেন। বিশ্বকাপের মঞ্চে স্পিডের এই লাইভ সম্প্রচার যে নতুন প্রজন্মের খেলা দেখার ধরণ বদলে দেবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
সূত্র: ওয়্যার্ড