স্মার্টফোন কি বিশ্বজুড়ে জন্মহার কমার পেছনে ভূমিকা রাখছে

স্মার্টফোনছবি: রয়টার্স

স্মার্টফোনের ব্যাপক বিস্তার এবং বিভিন্ন দেশে জন্মহার কমে যাওয়ার মধ্যে সম্পর্ক থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা। গবেষকদের মতে, আইফোনের আবির্ভাবের পর মানুষের সামাজিক আচরণ ও জীবনযাপনের ধরনে যে পরিবর্তন এসেছে, তা জন্মহারের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। তবে জন্মহার কমে যাওয়ার জন্য শুধু স্মার্টফোনকে দায়ী করা যাবে না। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নানা পরিবর্তনও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তারপরও স্মার্টফোনের বিস্তার এবং জন্মহার কমে যাওয়ার সময়কাল প্রায় একই হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় ধরে দেশটির জন্মহার মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল। তবে ২০০৭ সালের পর থেকে জন্মহার কমার প্রবণতা স্পষ্ট হতে শুরু করে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ওই বছরই প্রথম আইফোন বাজারে এনেছিল অ্যাপল।

গবেষণাটিতে এমন একটি সময়ের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রে আইফোন ব্যবহারের সুযোগ ছিল শুধু এটিঅ্যান্ডটি নেটওয়ার্কের গ্রাহকদের জন্য। সে সময় দেশটির সব অঞ্চলে নেটওয়ার্ক কভারেজ সমান ছিল না। ফলে কোথাও আইফোন সহজলভ্য ছিল, আবার কোথাও ছিল সীমিত। এই পার্থক্যকে ভিত্তি করে বিভিন্ন অঞ্চলের জন্মহারের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করেন গবেষকেরা। তাঁদের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, যেসব এলাকায় আইফোন ব্যবহারের সুযোগ বেশি ছিল, সেসব এলাকায় জন্মহার তুলনামূলক দ্রুত কমেছে।

গবেষকদের মতে, স্মার্টফোন সরাসরি মানুষের প্রজননক্ষমতা কমিয়ে দেয় না। এটি মানুষের জীবনযাপন, সামাজিক যোগাযোগ এবং ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনে পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলতে পারে। স্মার্টফোনের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের দৈনন্দিন সময়ের বড় একটি অংশ চলে গেছে অনলাইন জগতে।

সামাজিক যোগাযোগ, বিনোদন, তথ্য অনুসন্ধান এমনকি সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও ডিজিটাল মাধ্যমের ব্যবহার বেড়েছে। ফলে মুখোমুখি যোগাযোগ ও সামাজিক মেলামেশার ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। গবেষকদের ধারণা, মানুষের একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হওয়া, সম্পর্ক গড়ে তোলা, দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের পরিকল্পনা এবং পরিবার শুরু করার সিদ্ধান্তে এসব পরিবর্তনের প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে স্মার্টফোনের মাধ্যমে জন্মনিয়ন্ত্রণ, প্রজননস্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনাবিষয়ক তথ্য সহজলভ্য হওয়ায় তরুণেরা আগের তুলনায় বেশি সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন। অর্থাৎ স্মার্টফোন নিজে জন্মহার কমাচ্ছে না। এটি এমন একটি সামাজিক বাস্তবতা তৈরি করেছে, যা মানুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে।

একই ধরনের ফল পাওয়া গেছে আরেকটি গবেষণায়। বিশ্বের ১০০টির বেশি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, স্মার্টফোনের ব্যবহার দ্রুত বাড়তে শুরু করার পর অনেক দেশে কিশোরী মাতৃত্বের হারও দ্রুত কমতে শুরু করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই প্রবণতা কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল বা সংস্কৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ভিন্ন অর্থনৈতিক অবস্থা, সামাজিক কাঠামো, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও নীতিমালা থাকা দেশগুলোতেও একই ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে। আর তাই স্মার্টফোনকে জন্মহার পরিবর্তনের সম্ভাব্য বৈশ্বিক প্রভাবক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জন্মহার কমে যাওয়ার বিষয়টি শুধু প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আবাসনের উচ্চ মূল্য, পেশাগত লক্ষ্য অর্জনের চাপ, দেরিতে বিয়ে, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মানসিক চাপ এবং সামাজিক মূল্যবোধের পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলোও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ ইউরোপের অনেক দেশ বর্তমানে নিম্ন জন্মহারের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। এসব দেশের ক্ষেত্রে একক কোনো কারণ নয়, বরং একাধিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা একযোগে কাজ করছে।

সূত্র: টেকলুসিভ