রিপনদের পরিবারের অবস্থা এমনিতেই ছিল অসচ্ছল। বয়স্ক বাবা কাজ করতে পারতেন না। রিপনের বড় ভাই ওয়েলডিং ওয়ার্কশপ চালাতেন। আয় স্বল্প। কোনোমতে চলত রিপনদের পরিবার। বিয়ে করার পর অবস্থা আরও জটিল হলো।

আয়–রোজগার করতে ২০১৪ সালে ঢাকায় চলে আসেন রিপন। তৈরি পোশাকশিল্পের একটি বায়িং হাউসে মাসে আট হাজার টাকা বেতনে চাকরি শুরু করেন রিপন মৃধা। খরচের তুলনায় এ আয় তেমন কিছুই না।

২০১৬ সালে চাকরি পরিবর্তন করেন রিপন। একটি তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে ডেটা এন্ট্রি অপারেটরের কাজে যোগ দেন। বেতন মাসে ১০ হাজার টাকা। রিপন মৃধা প্রথম আলোকে বলেন, ‘বেতন কম হলেও এখানে এসে আমার লাভ হলো। আমি কম্পিউটারের বিভিন্ন কাজ শেখা শুরু করলাম।’

কম্পিউটারে কাজ করতে করতেই ফ্রিল্যান্সিং বিষয়টি সম্পর্কে জানতে পারেন রিপন মৃধা। খোঁজখবর নিয়ে জানতে শুরু করলেন কী শিখলে ফ্রিল্যান্সিং করতে পারবেন। নিজেকে গড়ে তোলায় মনোযোগ দিলেন। খুব ছোট পরিসরে ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজ শুরু করলেন। এটিই রিপনের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

রিপন মৃধা বলেন‌, ‘আমরা দুই ভাই ও এক বোন। সবার ছোট আমি। পরিবারের পুরো দায়িত্ব ছিল বড় ভাইয়ের কাঁধে। সচ্ছলতা মোটেও ছিল না পরিবারে। ফলে বিয়ের পর আমার ও আমার স্ত্রীর পড়াশোনার খরচ আমার জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াল। আমি চাকরির জন্য মরিয়া হয়ে উঠি, কিন্তু ভালো কোনো চাকরি পাচ্ছিলাম না। একটা ছোট চাকরি পেলাম। বিয়ের দুই বছর পর আমাদের প্রথম কন্যাসন্তান ফিহার জন্ম হয়। স্বল্প বেতনের অস্থায়ী চাকরি, স্ত্রীর পড়াশোনার খরচ, সদ্য জন্ম নেওয়া সন্তান—সব মিলিয়ে আমি হতাশ হয়ে পড়ি।’

এতটাই হতাশা ভর করেছিল যে রিপন একসময়  প্যানিক ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত হন। মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। রিপন বললেন, ‘তখন একবার আত্মহত্যা করার চিন্তাও মাথায় এসেছিল। আমার পাশে দাঁড়াতে আমার স্ত্রী বাধ্য হয়ে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেয়। এরপর থেকে আমার মানসিক চাপ কিছুটা কমে। ভিন্নধর্মী কিছু করার চেষ্টা শুরু করি।’

২০১৬ থেকে শুরু

রিপন মৃধা ২০১৬ সালের আগস্টে ঢাকার প্রতিষ্ঠানে চাকরি শুরু করার পর একটু একটু করে টাকা জমান। কিছুদিন পর নিজের জমানো ও ধারের কিছু টাকায় একটি ল্যাপটপ কেনেন। তখন থেকেই অনলাইনে ডিজিটাল বিপণন, সার্চ ইঞ্জিন অপ্টিমাইজেশন (এসইও ) শেখা শুরু করেন। এরপর শেখেন ওয়েবসাইট ডিজাইন (ওয়ার্ডপ্রেস এবং শপিফাই)। অনলাইনে ডিজিটাল বিপণন বিষয়ের একটি পরীক্ষায় অংশ নেন, সনদও পান।

২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় চাকরি চলে যায় রিপন মৃধার। চাকরি হারিয়ে বিধিনিষেধের সময়ে ফ্রিল্যান্সিংয়ের বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেন তিনি।

ফ্রিল্যান্সিংয়ে এল সফলতা

রিপন মৃধা বলেন, ‘আমার ফ্রিলান্সিং শুরু হয় অনলাইনে কাজ পাওয়ার জায়গা ফাইভআর থেকে। অ্যাকাউন্ট খোলার তিন দিনের মাথায় একজন মার্কিন ক্রেতার কাছ থেকে  ৪০ ডলারের একটি কাজ পাই। কাজের মান দেখে ক্রেতা খুশি হয়ে আমাকে পাঁচ তারকা রেটিং দেন। সঙ্গে ১০ ডলার বোনাসও দেন।’ ভালো অভিজ্ঞতা দিয়েই শুরু হয় রিপনের ফ্রিল্যান্সিং।

দিন দিন কাজের পরিমাণ বাড়তে থাকে, কঠোর পরিশ্রম করেন রিপন। নির্দিষ্ট সময়ে গ্রাহকদের কাজ শেষ করে দেন। ২০২০ সালের মাঝামাঝি যুক্তরাজ্যের একজন গ্রাহক ৫৫০ পাউন্ডের (তৎকালীন হিসাবে প্রায় ৬০ হাজার টাকা) বিনিময়ে  মাসিক একটি কাজের সুযোগ দেন। কাজের চাপ বাড়তে থাকায় রিপন মৃধা অন্য কয়েকজন ফ্রিল্যান্সারকেও যুক্ত করেন।

রিপন বলেন,  ‘এখন বিভিন্ন অনলাইন মার্কেটপ্লেস এবং এর সরাসরি গ্রাহকের সঙ্গেও কাজ করি। এ পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের ১৩০ জনের বেশি গ্রাহকের কাজ করতে পেরেছি। বর্তমানে আমার প্রতিমাসে গড়ে প্রায় তিন হাজার ডলার (তিন লাখ টাকার বেশি) আয় হয়। আমার সঙ্গে আরও ২৩ জন কাজ করছেন।’

শেখাচ্ছেন অন্যদেরও

নিজের কর্মী চাহিদা পূরণ করার পাশাপাশি অন্যদের ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ দিতে রিপন মৃধা ও তার ফ্রিলান্সার বন্ধু সুকান্ত ধর সম্মিলিত ভাবে নরসিংদীতে ডি অ্যান্ড ডি একাডেমি একটি প্রতিষ্ঠান চালু করেছেন। প্রতিষ্ঠানটির বেশ কয়েকজন প্রশিক্ষণার্থীও তাঁর সঙ্গে কাজ করছেন।

রিপন মৃধা বলেন, ‘খারাপ সময় পাড়ি দিয়ে নিজে কাজ করতে পারছি এবং অন্যদের আয় করার সুযোগ করে দিতে পারছি—এটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া।’ হতাশা জয় করা রিপন মৃধা তাই স্থানীয় অনেক তরুণের জন্যই অনুপ্রেরণা।

বছরখানেক আগে আরেক মেয়ে ফাবিহা এসেছে রিপন–তাপসীর সংসারে। দুই মেয়ে ফিহা ও ফাবিহা এবং স্ত্রী তাপসীকে নিয়ে রিপন এখন থাকেন নরসিংদী শহরে।