তিস্তার পাড় থেকে মুসনাদ এখন বিশ্ববাজারে, করেছেন ৯০০ জনের কর্মসংস্থান
রংপুরের গঙ্গাচড়ার গান্নারপাড় গ্রামে তখনো ভোর, মানে ছিল কুয়াশাভেজা মাঠ, তিস্তার বাতাস আর স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি। সেই গ্রামের এক সাধারণ শিক্ষক পরিবারের ছেলেটি হয়তো জানত না—একদিন তাঁর পথচলার গল্পই বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের তরুণদের অনুপ্রেরণার ভাষা হয়ে উঠবে। ছেলেটির নাম মুসনাদ ই আহমেদ।
একসময় মুসনাদ ই আহমেদ মাত্র ৭ হাজার টাকার বেতনে কল সেন্টারে চাকরি করতেন। আজ তাঁর নিজের গড়া প্রতিষ্ঠান স্কাইটেক সলিউশনসে ৯০০-এর বেশি কর্মী কাজ করছেন। গত জুন মাসে চট্টগ্রামের খুলশী কনভেনশন হলে অনুষ্ঠিত ‘বিপিও (বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং) সামিট বাংলাদেশ ২০২৬ (চট্টগ্রাম)’-এ দেখা হয় স্কাইটেক সলিউশনসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মুসনাদ ই আহমেদের সঙ্গে। সেখানেই পরিচয়, এরপর ঢাকায় তাঁর পান্থপথ ও উত্তরা কার্যালয় ঘুরে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
শৈশব, শিক্ষা ও জীবনের সবচেয়ে বড় আঘাত
বীর মুক্তিযোদ্ধা ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মরহুম সাদেকুল ইসলামের সন্তান মুসনাদ ছোটবেলা থেকেই সততা, শৃঙ্খলা ও আত্মসম্মানের শিক্ষা পেয়েছেন। মা মোছা. কোহিনুর বেগমের স্নেহে বড় হওয়া তিন ভাই-বোনের সংসারে অর্থের প্রাচুর্য ছিল না, তবে ছিল সীমাহীন স্বপ্ন।
২০০২ সালে উচ্চমাধ্যমিকে পড়ার জন্য তিনি ভর্তি হন ঢাকার কুর্মিটোলার বিএএফ শাহীন কলেজে। গ্রামের ছেলে হিসেবে রাজধানীর নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া সহজ ছিল না। এরই মধ্যে নেমে আসে জীবনের সবচেয়ে বড় আঘাত—উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার মাত্র তিন মাস আগে বাবা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়ে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটি হঠাৎ শয্যাশায়ী হয়ে পড়ায় সংসারে নেমে আসে চরম অনিশ্চয়তা। স্তব্ধ হয়ে যায় সব স্বপ্ন।
দক্ষতার সন্ধান
উচ্চমাধ্যমিক শেষে তিনি ভর্তি হন রয়্যাল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকায়। আর্থিক সংকট বারবার পথ আটকেছে—কখনো টিউশনি করেছেন, কখনো কোচিং সেন্টারে কাজ করেছেন। সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে ২০০৯ সালে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শেষ করেন। এ সময়েই তিনি উপলব্ধি করেন—শুধু ডিগ্রি নয়, দক্ষতাই ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় পুঁজি।
তিনি যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে কম্পিউটার ও স্পোকেন ইংলিশের প্রশিক্ষণ নেন। বাসে যাতায়াতের সময় রাস্তার পাশের সাইনবোর্ড পড়ে ইংরেজি উচ্চারণ অনুশীলন করতেন। ছোট ছোট এই চর্চাই পরে তাঁর পেশাগত জীবনের শক্ত ভিত্তি গড়ে দেয়।
কর্মজীবনের সূচনা ও প্রথম আন্তর্জাতিক সাফল্য
২০০৮ সালে মাত্র ৭ হাজার টাকা বেতনে একটি কল সেন্টারে কাস্টমার সার্ভিস এজেন্ট হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন মুসনাদ। রাতের শিফটে চাকরি আর দিনের বেলায় টিউশনি—জীবন তখন ছিল নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রমের অদম্য নাম। তবে তাঁর কাছে প্রতিটি চাকরিই ছিল শেখার জায়গা, প্রতিটি দায়িত্ব ছিল নিজের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ।
এরপর তিনি আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসে (আউটসোর্সিংয়ে কাজ দেওয়া-নেওয়ার ওয়েবসাইট) কাজ শুরু করেন। টেলিমার্কেটিং ও কাস্টমার সার্ভিসে কাজ করে প্রথমবার ৪০০ মার্কিন ডলার আয় করেন। সেই অর্থের পরিমাণের চেয়েও বড় ছিল আত্মবিশ্বাস—বাংলাদেশে বসেও বিশ্ববাজারে কাজ করা সম্ভব।
স্কাইটেক সলিউশনস ও চরম সংকট
২০১৩ সালে সঞ্চিত দেড় লাখ টাকা এবং ব্যাংক থেকে ৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে দুটি ভাড়া কক্ষে মাত্র তিনটি ল্যাপটপ দিয়ে শুরু করেন ‘স্কাইটেক সলিউশনস’ নামের নিজের প্রতিষ্ঠান। শুরুর দিনগুলোয় গ্রাহক পাওয়া, দক্ষ কর্মী তৈরি করা ও আন্তর্জাতিক বাজারে আস্থা অর্জন—প্রতিটি ধাপই ছিল কঠিন পরীক্ষা।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে ২০১৬ সালে। আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তনে একের পর এক প্রকল্প বন্ধ হয়ে যায়। ৪৫ জন কর্মীর প্রতিষ্ঠান নেমে আসে মাত্র ৯ জনে। অনেকেই ভেবেছিলেন, এখানেই গল্প শেষ!
নিজের জমানো ১০ লাখ টাকার এফডিআর ভেঙে তিনি নতুন করে শুরু করেন। বিপদের দিনে পাশে থাকা সেই ৯ জন কর্মীকে তিনি হারাতে চাননি। তাঁর সেই সাহসী সিদ্ধান্তই বদলে দেয় প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ। কয়েক মাসের মধ্যেই নতুন বাজার, নতুন গ্রাহক আর নতুন সম্ভাবনা নিয়ে ঘুরে দাঁড়ায় স্কাইটেক।
বিশ্বজুড়ে সেবার প্রসার ও ভবিষ্যৎ স্বপ্ন
আজ প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য বিপিও ও তথ্যপ্রযুক্তি-নির্ভর সেবা (আইটিইএস) খাতে কাজ করছে। বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীরাই এখান থেকে আন্তর্জাতিক মানের কাস্টমার সার্ভিস, লিড জেনারেশন এবং ব্যাক-অফিস সাপোর্ট পরিচালনা করছেন।
মুসনাদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রযুক্তি নয়, মানুষের দক্ষতাই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। একসময় আমি নিজে কল সেন্টারে চাকরি করতাম, এখন আমার নিজের কল সেন্টারে ৯০০ জন কাজ করে। এই সংখ্যা আমি তিন হাজারে নিয়ে যেতে চাই।’
মুসনাদ আরও বলেন, ‘আমি তিস্তারপারের ছোট্ট গ্রামের ছেলে। আমার গল্প আসলে শুধু একজন উদ্যোক্তার গল্প নয়—এটি আত্মবিশ্বাসের গল্প, লড়াইয়ের গল্প, পড়ে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়ানোর গল্প।’
বর্তমানে স্কাইটেক সলিউশনসে ৯০০-এর বেশি কর্মী কর্মরত। একসময় যে তরুণ নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েই অনিশ্চয়তায় ছিলেন, আজ তিনিই শত শত মানুষের জীবিকার সুব্যবস্থা করেছেন। ব্যবসার পাশাপাশি মুসনাদ ই আহমেদ দেশের বিপিও খাতের উন্নয়নেও কাজ করছেন।