ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে ঝুঁকিতে দেশের ফ্রিল্যান্সাররা
সারা দেশে সাম্প্রতিক সময়ের বিদ্যুৎ–বিভ্রাটে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন যেমন ওলটপালট হচ্ছে, তেমনি বড় ধরনের আর্থিক ও পেশাগত সংকটে পড়েছেন দেশের ফ্রিল্যান্সাররা। আন্তর্জাতিক বাজারে সময়মতো কাজ জমা দেওয়া, উচ্চগতির ইন্টারনেট সচল রাখা এবং বিদেশি গ্রাহকদের সঙ্গে নির্ধারিত অনলাইন বৈঠকে উপস্থিত থাকার ওপর নির্ভর করে এ খাতের টিকে থাকা। তবে বিদ্যুৎ ও দুর্বল সংযোগের কারণে কাজ হারানোর পাশাপাশি বহির্বিশ্বে তৈরি হচ্ছে আস্থার সংকট। প্রতিবেশী দেশগুলোর মতো বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সারদের সংখ্যা নিয়েও দ্বিমত রয়েছে। বাংলাদেশে বিভিন্ন তথ্য ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমানে প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার থেকে ১০ লাখ ফ্রিল্যান্সার রয়েছেন।
হাতছাড়া হচ্ছে নতুন কাজ
কুষ্টিয়া জেলার সাইফুর রহমান আন্তর্জাতিক মাধ্যমে একজন ‘টপ রেটেড ফ্রিল্যান্সার’। ডিজিটাল মার্কেটিং, গুগল অ্যাডস ও এসইও নিয়ে কাজের পাশাপাশি নিজের একটি এজেন্সির মাধ্যমে অনেকের কর্মসংস্থানও তৈরি করেছেন তিনি। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সভার মাঝখানে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলে আইপিএস থাকলেও ডেস্কটপ পুনরায় চালু হতে কিছু সময় লাগে। এতে অতি গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট হয় এবং আন্তর্জাতিক গ্রাহকের কাছে পেশাগত ভাবমূর্তি নষ্ট হয়।’ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত হলে বৈশ্বিক বাজারে এজেন্সিগুলোর পরিসর বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
একই জেলার বলরামপুর গ্রামের ওয়েব অ্যানালিটিকস ও গুগল অ্যাডস বিশেষজ্ঞ বাপ্পি হোসেনের অভিজ্ঞতাও তিক্ত। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে নির্ধারিত সভা হাতছাড়া হওয়া এবং কাজের ডেডলাইন পূরণ না হওয়ার মতো জটিলতায় পড়ছেন তিনি। বাপ্পি প্রথম আলোকে বলেন, ‘কয়েকজন গ্রাহককে সমস্যার কথা জানালে তাঁরা দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ফ্রিল্যান্সিংয়ে সার্বক্ষণিক সংযোগ ও সঠিক সময়ে সরবরাহ জরুরি। বারবার এমন ঘটলে গ্রাহকের আস্থা হারানোর পাশাপাশি নতুন কাজের সুযোগ নষ্ট হয়ে যায়।’
ডিভাইস ক্ষতি ও সরাসরি আর্থিক ক্ষতি
পাবনার গুগল অ্যাডস ও লোকাল এসইও এক্সপার্ট স্মৃতি খাতুন বলেন, লোডশেডিংয়ের প্রভাবে সরাসরি কাজ হারাতে হচ্ছে তাঁকে। নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত ৮ তারিখ রাত তিনটায় আমার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মিটিং ছিল। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় আমি মিটিংয়ে যুক্ত হতে পারিনি এবং কাজটি হাতছাড়া হয়ে যায়। অনেকেই এভাবে কাজ হারাচ্ছেন।’
স্মৃতি খাতুন আরও উল্লেখ করেন, বারবার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার কারণে ওয়াইফাই সংযোগ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে, কাজের গতি কমে যাচ্ছে এবং অনেক মূল্যবান ডিভাইস ও কম্পিউটার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
পেশাগত বিশ্বাসযোগ্যতা ও আয়ে বড় ধাক্কা
কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার টপ রেটেড ফ্রিল্যান্সার ফজলে এলাহী এ পরিস্থিতিকে দেশের সামগ্রিক ফ্রিল্যান্সিং খাতের জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, ‘লোডশেডিং শুধু কাজের সময় নষ্ট করছে না; এটি ক্লায়েন্টের সঙ্গে যোগাযোগ, সময়মতো কাজ সরবরাহ, পেশাগত বিশ্বাসযোগ্যতা এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। বিদেশি বায়ারদের সঙ্গে সমন্বয় করা কঠিন হয়ে পড়ায় এখন পুরোনো ক্লায়েন্ট ধরে রাখাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম সম্ভাবনাময় এই খাতকে বাঁচাতে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের তরুণদের সুনাম ধরে রাখতে তৃণমূল পর্যায়ের আইটি পেশাজীবীদের জন্য অন্তত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট অবকাঠামো নিশ্চিত করার দাবি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের।
টপ রেটেড ফ্রিল্যান্সার এবং ফাউন্ডার, টিম ম্যাভিনের কাজী মামুন প্রথম আলোকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে এই শিল্পে কাজ করা এবং নিজের একটি ইনহাউস টিম পরিচালনার অভিজ্ঞতার জায়গা থেকে বলতে পারি, সাম্প্রতিক এই লোডশেডিং পরিস্থিতি বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সিং খাতকে আক্ষরিক অর্থেই খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। নতুন থেকে শুরু করে সিনিয়র পেশাজীবীরা প্রতিদিন গ্রাহকের সঙ্গে সভা মিস করছেন, কাজের ডেডলাইন ধরতে গিয়ে চরম হিমশিম খাচ্ছেন।’ তিনি প্রথম আলোকে আরও বলেন, সবচেয়ে বড় অশনিসংকেতটি এসেছে ফাইভআরের মতো শীর্ষ মার্কেটপ্লেস থেকে। বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সারদের প্রোফাইলে তারা যে অফিশিয়াল ওয়ার্নিং নোটিশ ঝুলিয়ে দিয়েছে, তা বিশ্ববাজারে আমাদের জন্য এক মারাত্মক নেতিবাচক বিজ্ঞাপন। গ্লোবাল ক্লায়েন্টদের প্রকাশ্যে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ–সংকটের কারণে ডেলিভারিতে বিঘ্ন ঘটতে পারে। ফ্রিল্যান্স কমিউনিটির একজন প্রতিনিধি হিসেবে এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের বলে আমি মনে করি। তিল তিল করে গড়ে তোলা আমাদের এই আস্থার জায়গাটি একবার নষ্ট হয়ে গেলে বা ক্লায়েন্টরা একবার মুখ ফিরিয়ে নিলে সেই হারানো গ্লোবাল মার্কেট পুনরুদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব।’
যাঁরা রাত জেগে কাজ করে দেশের অর্থনীতিতে সরাসরি রেমিট্যান্স যুক্ত করছেন, তাঁদের জন্য এই ধরনের অবকাঠামোগত ব্যর্থতা কোনোভাবেই কাম্য নয়। দেশের উদীয়মান আইটি ও ফ্রিল্যান্স খাতকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে অবিলম্বে এই বিদ্যুৎ–সংকটের একটি টেকসই সমাধান নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।