মাছ নিয়ে ফারজানার সফল উদ্যোগ, এখন কর্মী ৭০
কিশোরগঞ্জের ভৈরব কিংবা চট্টগ্রামের ফিশারিঘাট মাছের আড়ত। রাত ৩টা থেকে ৪টার দিকে যখন কর্মচাঞ্চল্য তুঙ্গে, তখন সেখানে ভিড়ের মধ্যে দেখা মিলত এক নারীর। কাদা-পানির মাখামাখি আর হাজারো পুরুষের ভিড়ে তিনি মাছ চিনছেন, শিখছেন মাছ সংরক্ষণের কায়দা। তিনি ফারজানা আকতার । একসময় করতেন টেলিভিশন সাংবাদিকতা, আর এখন তিনি সফল উদ্যোক্তা। তাঁর প্রতিষ্ঠান ‘রিভার ফিশ’ এখন অনেকের কাছেই আস্থার নাম। ফারজানা একা শুরু করেছিলেন ২০১৯ সালে, এখন তাঁর প্রতিষ্ঠানে ৭০ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে। গত শুক্রবার রাজধানীর হাতিরঝিল সংলগ্ন এলাকায় রিভার ফিশের কার্যালয়ে কথা হয় ফারজানা আকতারের সঙ্গে।
সংগ্রামের শুরু যেখানে
ফারজানা আকতারের বড় হয়ে ওঠা কুমিল্লায়। ১৯৯৭ সালে খুব ছোটবেলায় বাবাকে হারান তিনি। মা আর ছোট বোনকে নিয়ে শুরু হয় এক কঠিন জীবনযুদ্ধ। সংসারের হাল ধরতে সপ্তম শ্রেণিতে পড়াকালীন ৩০০ টাকা বেতনে শুরু করেন টিউশনি। পড়াশোনার পাশাপাশি কখনো এনজিওতে কাজ করেছেন, কখনো কিন্ডারগার্টেন স্কুলে পড়িয়েছেন, আবার কখনো দর্জির কাজ করে চালিয়েছেন সংসারের চাকা। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও পড়াশোনা থামাননি। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ থেকে সমাজকর্মে উচ্চশিক্ষা শেষ করে ২০১৪ সালে আসেন ঢাকায়। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর টেলিভিশন সাংবাদিকতার নতুন অধ্যায়।
উদ্যোক্তা হওয়ার ঝোঁক ও ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা
টেলিভিশন সাংবাদিকতা বাইরের মানুষের কাছে আকর্ষণীয় মনে হলেও, ঢাকার আকাশছোঁয়া ব্যয়ের জীবনে টিকে থাকা ফারজানার জন্য ছিল এক নীরব সংগ্রাম। বাড়তি আয়ের আশায় ২০১৮ সালে ‘টুশিস কিচেন’ নামে ফুডপান্ডার মাধ্যমে খাবার সরবরাহ শুরু করেন তিনি। এরপর ‘ফেরিওয়ালা’ নামে একটি অনলাইন পেজ খুলে জামদানি শাড়ি ও রুহিতপুরের লুঙ্গি বিক্রি করতেন।
কিন্তু শাড়ি–লুঙ্গির ব্যবসায় নিজেকে ঠিক মানিয়ে নিতে পারছিলেন না ফারজানা। সাংবাদিকতার ব্যস্ত শিডিউলের কারণে শাড়ির সূক্ষ্ম খুঁটিনাটি—যেমন কুঁচি কিংবা ব্লাউজ পিস সম্পর্কে তাঁর ধারণা ছিল সীমিত। ক্রেতাদের নানা কারিগরি প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে না পেরে তিনি দ্রুতই একটি বড় সত্য উপলব্ধি করেন, যে পণ্য সম্পর্কে নিজের গভীর আবেগ বা পর্যাপ্ত জ্ঞান নেই, সেখানে সফল হওয়া অসম্ভব। এই উপলব্ধি থেকেই ২০১৯ সালে শাড়ির ব্যবসা গুটিয়ে নেন তিনি। তবে দমে যাননি, বরং ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আবার শুরু করেন।
নদী থেকে ব্যবসায় ফেরা
সাংবাদিকতা করার সময় ফারজানা দীর্ঘদিন নদী দখল ও দূষণ নিয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ করেছেন। এই কাজের সূত্রেই তিনি গভীরভাবে খেয়াল করেন, রাজধানীর বাজারে সাধারণ মানুষের জন্য ফরমালিনমুক্ত এবং নদীর তাজা মাছ পাওয়া কতটা দুঃসাধ্য। তিনি লক্ষ করেন, মূলত সঠিক সংরক্ষণের অভাব ও বিক্রেতাদের অসচেতনতার কারণে মাছের গুণাগুণ নষ্ট হয়ে যায়। নাগরিক জীবনের এই বড় সংকটকেই তিনি নিজের নতুন সম্ভাবনায় রূপ দেন। বাজারব্যবস্থার এই ফাঁকটুকু পূরণ করার লক্ষ্য নিয়ে ২০১৯ সালের মার্চে শুরু করেন মাছ নিয়ে তাঁর স্বপ্নের উদ্যোগ।
সফটওয়্যার প্রকৌশলী স্বামী যখন পাশে
বাঙালির চিরন্তন পরিচয় ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ ঐতিহ্যকে ডিজিটাল যুগে আরও সহজলভ্য করে তুলছেন এই দম্পতি। ব্যস্ত নাগরিক জীবনে নদী বা হাওরের টাটকা মাছ খুঁজে পাওয়া যখন দুষ্কর, তখন সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় সরাসরি জলাশয়ের মাছ পৌঁছে দিতে কাজ করছেন ফারজানা আকতার ও তাঁর স্বামী সফটওয়্যার প্রকৌশলী তানভীর আজাদ। তাঁদের যৌথ প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছে অনলাইন মাধ্যম ‘রিভার ফিশ’।
শুরু থেকেই ফারজানার উদ্যোগের সঙ্গে ছায়ার মতো ছিলেন তানভীর আজাদ। ফারজানা ঘুরে বেড়ান দেশের বিভিন্ন জেলায়, পরিচয় করিয়ে দেন বিল ও নদীর বিলুপ্তপ্রায় সব দেশি মাছের সঙ্গে। আর সেই মুহূর্তগুলো ক্যামেরাবন্দী করেন তানভীর। ২০২০ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর তাঁদের এই পেশাদার সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়। বর্তমানে তানভীর তাঁর সফটওয়্যার প্রকৌশল জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল মার্কেটিং এবং ওয়েবসাইটের কারিগরি দিকগুলো সামলাচ্ছেন।
তানভীর আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা মূলত নদী, হাওর, বিল এবং সমুদ্রের প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা মাছ সংগ্রহ করি। আমাদের লক্ষ্য হলো মাছের কৃত্রিমতা দূর করে একদম টাটকা স্বাদ গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়া।’ তাঁদের সংগ্রহে রয়েছে হাওরের মাছ, ধনু নদীর পাঁচমিশালি মাছ, বাতাসি, গুতুম, বিলের দেশি কই, মাগুর ও শোল। নদীর কাজলি, মধু টেংরা, পাবদা এবং বড় আকারের কাতল, কোরাল। বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে আছে কাপ্তাই লেকের পাবদা, হাকালুকি হাওরের বড় মাছ, সুনামগঞ্জের কালো চিংড়ি, প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা গলদা ও ডিমা চিংড়ি।
মাঝরাতে আড়তে আড়তে
ব্যবসা শুরুর আগে ফারজানা একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নেন—তাঁকে আগে মাছ চিনতে হবে। এই সংকল্প থেকে টানা তিন মাস তিনি গভীর রাতে চষে বেড়িয়েছেন রাজধানীর কারওয়ান বাজার কিংবা যাত্রাবাড়ীর বড় বড় মাছের আড়ত। একজন নারীর জন্য রাত ২টা বা ৪টার দিকে ওই পুরুষতান্ত্রিক পরিবেশে যাওয়াটা ছিল এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। কিন্তু অভিজ্ঞতাটা ছিল একেবারেই ভিন্ন ও ইতিবাচক। সেখানকার তথাকথিত ‘অশিক্ষিত’ শ্রমিক ও মহাজনেরা তাঁকে দেখে কটু কথা বলা তো দূরের কথা, বরং পরম মমতায় মাছ চিনতে সাহায্য করেছেন। ফারজানা আকতার স্মৃতিচারণা করে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাকে দেখে আড়তদারেরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করতেন আপা, এত রাতে এখানে কী করেন? আমি যখন বলতাম মাছের ব্যবসা করার জন্য মাছ চিনতে এসেছি, তাঁরা দারুণ উৎসাহ দেখাতেন। বলতেন, আসেন আপা আপনাকে মাছ দেখাই। কাদা-পানিতে মাখামাখি সেই ভিড়েও কেউ আমাকে ধাক্কা পর্যন্ত দিত না। উল্টো মহাজনেরা যত্ন করে শিখিয়ে দিতেন কোন মাছ কোন জেলা বা কোন নদী থেকে এসেছে।’
সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা যখন ব্যবসায়িক কৌশল
একজন দক্ষ সাংবাদিকের গবেষণার অভ্যাসকে ফারজানা দারুণভাবে কাজে লাগিয়েছেন তাঁর ব্যবসায়। মাছের সঠিক উৎস নিশ্চিত করতে তিনি নিয়মিত যোগাযোগ করতেন জেলা মৎস্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে। এমনকি কোনো নির্দিষ্ট মাছ কোন জনপদে ভালো পাওয়া যায়, তা জানতে সাহায্য নিয়েছেন বাংলাপিডিয়ারও। মাছ যেন ঢাকায় আনার পথে গুণগত মান না হারায়, সে জন্য জেলেদের কাছ থেকে শিখে নিয়েছেন প্যাকিংয়ের বিশেষ কৌশল। মাছের খোঁজে তিনি ছুটে গিয়েছেন দেশের নানা জেলার নদী, খাল আর বিলের পাড়ে।
সাফল্যের জয়গান
শুরুর পথটা ফারজানা পাড়ি দিয়েছেন একদম একা। সারা দিন অফিস করে রাতে নিজেই ক্রেতাদের বার্তার উত্তর দিতেন। ২০১৯ সালের আগস্টে মাত্র দুজন কর্মী নিয়ে শুরু হওয়া সেই ছোট উদ্যোগটি আজ ডালপালা মেলে বিশাল মহিরুহে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে তাঁর প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন ৭০ জন কর্মী। ২০২০ সালে করোনা মহামারির কঠিন সময়ে যখন চারদিকে কর্মসংস্থানের সংকট, তখন ফারজানা সাহসী সিদ্ধান্ত নেন। সাংবাদিকতার পেশা ছেড়ে পূর্ণকালীন উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মনিয়োগ করেন নিজের প্রতিষ্ঠান ‘রিভার ফিশ’-এ। দেশ ছাড়িয়ে প্রবাসেও তারা জায়গা করে নিয়েছে।
বিদেশে অবস্থানরত অনেক বাংলাদেশিই দেশের মাছের স্বাদ মনে মনে খোঁজেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক ভ্রমণে কাঁচা মাছ বহন করা বেশ ঝক্কির ব্যাপার। এই সমস্যার সমাধানে ‘রিভার ফিশ কিচেন’ চালু করেছে এক অভিনব সেবা। তারা গ্রাহকের পছন্দ অনুযায়ী মাছ ঐতিহ্যবাহী বাঙালি স্বাদে ভেজে এমনভাবে প্যাকিং করে দেয়, যা প্রবাসীরা সহজেই সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পারেন। এ ছাড়া তারা বিমানবন্দরে সরবরাহের সুবিধাও প্রদান করে থাকে। শুধু মাছই নয়, রিভার ফিশে পাওয়া যাচ্ছে গ্রামের দেশি মুরগি, হাঁস এবং প্রি-অর্ডারের মাধ্যমে খাসির মাংস। যাঁরা শুঁটকিপ্রেমী, তাঁদের জন্য রয়েছে কিশোরগঞ্জের বিখ্যাত চ্যাপা শুঁটকি, নিরাপদ ছুরি ও লইট্টা শুঁটকি ইত্যাদি।
ফারজানা আকতার প্রথম আলোকে বলেন, ‘নিজেকে কেবল “নারী” ভাবলে চলবে না, ভাবতে হবে মানুষ হিসেবে। জীবনের যেকোনো পরিস্থিতিতে আত্মবিশ্বাস থাকলে সব বাধা জয় করা সম্ভব।’ ফারজানার এই দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প আর রিভার ফিশের সাফল্য এখন অসংখ্য নারীর জন্য সাহসের উৎস। বর্তমানে তিনি নতুন নারী উদ্যোক্তা তৈরিতে কাজ করছেন; প্রশিক্ষণ আর ক্ষুদ্র বিনিয়োগের মাধ্যমে তাঁদের স্বাবলম্বী করে তোলাই এখন তাঁর লক্ষ্য।