ল্যান্ডফোনের যুগ কি আবার ফিরে আসছে

টিনক্যান নামের টেলিফোন ব্যবহার করছে এক শিশুছবি: টিনক্যান

একসময় ঘরের অপরিহার্য যোগাযোগমাধ্যম ছিল ল্যান্ডফোন। স্মার্টফোনের বিস্তারে সেই প্রযুক্তি ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছিল। তবে নতুন প্রজন্মের ব্যবহারধারা এবং অভিভাবকদের বাড়তি সচেতনতার প্রেক্ষাপটে ভিন্ন এক রূপে আবারও আলোচনায় এসেছে ল্যান্ডলাইনধর্মী ফোন। শিশুদের জন্য তৈরি ‘টিন ক্যান’ নামের একটি যন্ত্রকে ঘিরে সম্প্রতি প্রযুক্তিবিশ্বে এমন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এই যন্ত্র নিয়েই মেতেছে বর্তমানের জেন-আলফা প্রজন্ম।

প্রায় ১০০ মার্কিন ডলার দামের এই ফোন মূলত স্ক্রিনবিহীন ও তারযুক্ত। বড় আকারের বোতাম, পাকানো তার ও কল রেকর্ডিং সুবিধাসহ বার্তা রাখার যন্ত্র—সব মিলিয়ে এর নকশায় নব্বইয়ের দশকের ল্যান্ডফোনের পরিচিত ছাপ রয়েছে। তবে প্রযুক্তিগত দিক থেকে এটি আধুনিক। প্রচলিত টেলিফোন লাইনের পরিবর্তে যন্ত্রটি ওয়াইফাইয়ের মাধ্যমে যুক্ত থাকে। ফলে ব্যবহারকারীরা ইন্টারনেটভিত্তিক কলও করতে পারেন।

নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, ফোনটিতে কোনো অ্যাপ, বার্তা আদান-প্রদান বা গেমের সুবিধা নেই। সরাসরি কণ্ঠে কথোপকথনকেই এখানে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শিশুদের নিরাপদ যোগাযোগ নিশ্চিত করতে এতে নির্দিষ্ট যোগাযোগ তালিকা নির্ধারণের সুযোগ রাখা হয়েছে। অভিভাবকেরা একটি সহায়ক মুঠোফোন অ্যাপের মাধ্যমে যাঁদের অনুমোদন দেবেন, কেবল তাঁদের সঙ্গেই ফোনে কথা বলা যাবে। ফলে অজানা নম্বর বা অনাকাঙ্ক্ষিত কলের ঝুঁকি কার্যত থাকে না।

গত বছরের এপ্রিল মাসে বাজারে আসার পর থেকেই যন্ত্রটি ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইতিমধ্যে কয়েক লাখ ইউনিট বিক্রি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলভিত্তিক তিন উদ্যোক্তা—চেট কিটলসন, ম্যাক্স ব্লুমেন ও গ্রেম ডেভিস নিজেদের সন্তানের জন্য উপযোগী একটি ফোন খুঁজতে গিয়ে এই যন্ত্র তৈরির উদ্যোগ নেন। তাঁদের মতে, বাজারে প্রচলিত অধিকাংশ স্মার্টফোনে অতিরিক্ত প্রযুক্তি ও উন্মুক্ত প্রবেশাধিকার থাকায় শিশুদের জন্য তা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। সেই বাস্তবতা থেকেই সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের উপযোগী একটি বিকল্প তৈরি করার চেষ্টা করেছেন তাঁরা। নকশাগতভাবে প্রচলিত ল্যান্ডফোনের আদল বজায় রাখা হলেও শিশুদের আকৃষ্ট করতে ফোনটি নীল-সবুজ, বেগুনি-সাদা, হলুদ ও গোলাপি-কমলা এ চারটি উজ্জ্বল রঙে বাজারজাত করা হয়েছে। বিদ্যুৎ–সংযোগের মাধ্যমে চালিত এই যন্ত্র ওয়াই-ফাইয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকে এবং মুঠোফোন অ্যাপের মাধ্যমে সেটআপ সম্পন্ন করতে হয়।

ফোনটিতে একই ধরনের যন্ত্র ব্যবহারকারীদের মধ্যে বিনা খরচে কল করার সুবিধা রয়েছে। তবে সাধারণ ফোন নম্বরে যোগাযোগের জন্য মাসিক ৯ দশমিক ৯৯ ডলারের একটি সাবস্ক্রিপশন নিতে হয়। পাশাপাশি ‘কোয়াইট আওয়ার্স’ সুবিধাও রাখা হয়েছে, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময় ফোনে কল আসা-যাওয়া বন্ধ রাখা সম্ভব। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যন্ত্রটি নিয়ে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অনেক অভিভাবক। তাঁদের অনেকে জানিয়েছেন, এই ফোন ব্যবহারের মাধ্যমে শিশুরা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করছে এবং একই সঙ্গে ফোন ব্যবহারের মৌলিক শিষ্টাচার শিখছে। বর্তমানে ‘টিন ক্যান’ কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। যুক্তরাজ্যে এটি কবে চালু হবে, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি।

এদিকে ইংল্যান্ডে স্কুলে স্মার্টফোন ব্যবহারে সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার উদ্যোগের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের যন্ত্রের প্রতি আগ্রহ আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দেশটির পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ হাউস অব লর্ডসে সম্প্রতি শিশুকল্যাণ ও শিক্ষাসংক্রান্ত একটি বিলের সংশোধনী পাস হয়েছে। প্রস্তাবিত আইন কার্যকর হলে স্কুল চলাকালে স্মার্টফোন ব্যবহারে দেশজুড়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ হতে পারে, যদিও কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রাখার সুযোগ রাখা হয়েছে।

সূত্র: ডেইলি মেইল