স্মার্ট টি-শার্ট শনাক্ত করবে হৃদ্রোগ
বংশগত হৃদ্রোগ আগেভাগে শনাক্তে নতুন ধরনের একটি ‘স্মার্ট টি-শার্ট’ উদ্ভাবনের কাজ চলছে যুক্তরাজ্যে। গবেষকেরা বলছেন, দীর্ঘ সময় ধরে হৃদ্যন্ত্রের বৈদ্যুতিক সংকেত পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম পরিধানযোগ্য এই প্রযুক্তি অকালমৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
টি-শার্টটি যৌথভাবে উন্নয়ন করছেন যুক্তরাজ্যভিত্তিক দাতব্য সংস্থা ব্রিটিশ হার্ট ফাউন্ডেশন ও ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের গবেষকেরা। তাঁরা এমন একটি ব্যবহারবান্ধব ব্যবস্থা তৈরি করতে চান, যা বিরল ও বংশগত হৃদ্ছন্দজনিত রোগ শনাক্তে প্রচলিত পরীক্ষার সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে। বর্তমানে বুকে ব্যথা, মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে রোগীদের ইসিজি যন্ত্র ব্যবহার করতে দেওয়া হয়। এতে শরীরের নির্দিষ্ট স্থানে আঠালো ইলেকট্রোড বসিয়ে তারের মাধ্যমে কোমরে ঝোলানো মনিটরের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে হয়। গোসল বা দৈনন্দিন কাজের সময় যন্ত্রটি খুলে আবার সঠিকভাবে লাগানো বেশ ঝামেলার। পাশাপাশি অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন সব সময় উপস্থিত না থাকায় এক বা দুই দিনের পরীক্ষায় অনেক ক্ষেত্রেই সমস্যা ধরা পড়ে না। নতুন স্মার্ট টি-শার্টে কাপড়ের ভেতরেই সেলাই করা হয়েছে সর্বোচ্চ ৫০টি সূক্ষ্ম সেন্সর। আলাদা করে ইলেকট্রোড বসানোর প্রয়োজন নেই। সাধারণ পোশাকের মতোই এটি পরে থাকা যাবে। গবেষকদের মতে, টানা এক সপ্তাহ পর্যন্ত এটি ব্যবহার করা সম্ভব হবে। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে হৃদ্যন্ত্রের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে অনিয়মিত ছন্দ শনাক্তের সম্ভাবনা বাড়বে।
টি-শার্টে সংগৃহীত তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি কম্পিউটার ব্যবস্থায় পাঠানো হবে। সেখানে বিশেষভাবে তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সফটওয়্যার তথ্য বিশ্লেষণ করে কোনো অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করলে চিকিৎসককে সতর্কবার্তা পাঠাবে। গবেষকেরা বলছেন, এই প্রযুক্তি রোগনির্ণয়ের নির্ভুলতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। গবেষণা সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে প্রায় ৩ লাখ ৪০ হাজার মানুষ বংশগত হৃদ্রোগে আক্রান্ত। এসব রোগে বিপজ্জনক হৃদ্ছন্দের ঝুঁকি থাকে, যা হঠাৎ মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
যুক্তরাজ্যে প্রতি সপ্তাহে ৩৫ বছরের কম বয়সী অন্তত ১২ জন তরুণ এ ধরনের জটিলতায় প্রাণ হারান বলে জানা গেছে। হাসপাতালে ১০ মিনিটের নিয়মিত ইসিজি বা এমনকি ৪৮ ঘণ্টার পর্যবেক্ষণেও অনেক সময় হৃদ্ছন্দ স্বাভাবিক দেখা যায়। ফলে প্রকৃত সমস্যা চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক জাচারি হুইনেট বলেন, অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন সব সময় পরীক্ষার সময় ধরা পড়ে না বলেই রোগ নির্ণয়ে বিলম্ব হয়। দীর্ঘমেয়াদি ও আরামদায়ক পর্যবেক্ষণব্যবস্থা চালু করা গেলে বংশগত হৃদ্রোগ আগেভাগে শনাক্তের সুযোগ তৈরি হবে।
প্রকল্পটিতে সহযোগিতা করছেন ওয়াটফোর্ডের ৩৮ বছর বয়সী শিক্ষক কার্লি বেনজি। তিনি ব্রুগাডা সিনড্রোম নামের একটি গুরুতর বংশগত হৃদ্ছন্দজনিত রোগে আক্রান্ত। এ রোগ পরিবারে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে তার সন্তানদেরও ঝুঁকি রয়েছে। গবেষকদের মতে, সময়মতো শনাক্ত করা গেলে এ ধরনের রোগের ক্ষেত্রে জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব এবং হঠাৎ মৃত্যুর ঝুঁকি কমানো যায়। স্মার্ট টি-শার্টটির একটি প্রোটোটাইপ পরীক্ষা করা হবে ২০০ জন রোগী ও স্বেচ্ছাসেবীর ওপর। তাঁরা লন্ডনের হ্যামারস্মিথ হসপিটালের পিয়ার্ট রোজ গবেষণা ইউনিটে অংশ নেবেন। অংশগ্রহণকারীরা টানা তিন মাস পর্যন্ত টি-শার্টটি ব্যবহার করবেন। এ সময় প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা, নির্ভুলতা ও ব্যবহার কতটা সহজ, তা মূল্যায়ন করা হবে।
স্পোর্টস পোশাকের আদলে তৈরি টি-শার্টটি দৈনন্দিন পোশাকের নিচে পরে ঘুম, কাজ কিংবা চলাফেরার সময়ও ব্যবহার করা যাবে। কাপড়ের ভেতরে সংযুক্ত সূক্ষ্ম তার ও সেন্সরের মাধ্যমে হৃদ্যন্ত্রের বৈদ্যুতিক সংকেত ধারাবাহিকভাবে রেকর্ড হবে। গবেষকেরা আশা করছেন, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা–নিরীক্ষা শেষে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে প্রযুক্তিটি চিকিৎসকদের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করা যাবে। প্রাথমিকভাবে এটি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য তৈরি হলেও কার্যকর প্রমাণিত হলে ভবিষ্যতে শিশুদের হৃদ্যন্ত্র পর্যবেক্ষণেও এটি নতুন বিকল্প হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি অ্যাট্রিয়াল ফাইব্রিলেশনের মতো অন্যান্য হৃদছন্দজনিত সমস্যাও সহজে শনাক্তে এই প্রযুক্তি সহায়ক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সূত্র: ডেইলি মেইল