মশা কেন কিছু মানুষকে বেশি কামড়ায়

এডিস মশাছবি: রয়টার্স

প্রকৃতির ক্ষুদ্রতম জীবগুলোর আচরণ অনেক সময় বড় রহস্যের জন্ম দেয়। রহস্যময় এই পৃথিবীর বুকে রক্তচোষা মশার দল কীভাবে তাদের শিকার খুঁজে নেয়, তা নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। অনেকেরই মনে হয় মশা শুধু তাদেরই কামড়ায়। আশপাশের অন্য মানুষদের মশা পুরোপুরি এড়িয়ে চলে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই ধারণা মোটেও ভুল নয়। মশা কিছু মানুষের প্রতি আসলেই বেশি আকৃষ্ট হয়। ফ্রান্সের ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ ফর ডেভেলপমেন্টের গবেষক ফ্রেডেরিক সিমার্ড জানিয়েছেন, এটি কোনো ভুল ধারণা নয়। মশা কিছু মানুষের প্রতি অন্যদের চেয়ে বেশি আকৃষ্ট হয়। তবে আমরা সবাই সব সময় মশার চৌম্বকক্ষেত্র হয়ে থাকি না।

ফ্রেডেরিক সিমার্ডের মতে, মশা নিয়ে প্রচলিত কিছু জনপ্রিয় ধারণার কোনো ভিত্তি নেই। মশা নির্দিষ্ট রক্তের গ্রুপ পছন্দ করে, এমন ধারণার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ মেলেনি। এই বিষয়ে কিছু গবেষণা হলেও সেগুলো খুব কম মানুষের ওপর করা হয়েছিল। ত্বকের রং বা চোখের রঙের সঙ্গে মশার আকর্ষণের কোনো সম্পর্ক নেই। চুলের রঙের সঙ্গেও সম্পর্ক নেই। তবে শরীরের গন্ধের বড় ভূমিকা রয়েছে। আমাদের ত্বকের অণুজীব বা মাইক্রোবায়োটা দ্বারা উৎপাদিত অণুর মিশ্রণ মশার কাছে কম বা বেশি আকর্ষণীয় হতে পারে।

মশা এক মানুষ থেকে অন্য মানুষকে বেছে নেওয়ার জন্য কিছু সংকেত ব্যবহার করে। মানুষের শরীরের গন্ধ ও তাপ এর প্রধান কারণ। আমাদের নিঃশ্বাসের সঙ্গে বের হওয়া কার্বন ডাই–অক্সাইড মশাকে আকর্ষণ করে। শুধু স্ত্রী মশা মানুষকে কামড়ায়। তারা সূক্ষ্ম গ্রাহক অঙ্গ বা রিসেপ্টরের সাহায্যে এই সংকেতগুলো শনাক্ত করে। এরপর তারা নিজেদের লক্ষ্যবস্তু বেছে নেয়। এ বিষয়ে সুইডেনের বিজ্ঞানী রিকার্ড ইগনেল বলেন, মানুষ কার্বন ডাই–অক্সাইড ত্যাগ করে, যা মশাকে আকর্ষণ করে। এটিই প্রথম সংকেত, যা মশার আচরণকে সক্রিয় করে। প্রায় ১০ মিটারের মধ্যে মশা আমাদের শরীরের গন্ধ শনাক্ত করতে শুরু করে। কার্বন ডাই–অক্সাইডের সঙ্গে এই গন্ধের মিশ্রণ মশাকে আরও বেশি আকর্ষণ করে। মশা যখন আরও কাছে আসে, তখন শরীরের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নির্দিষ্ট কিছু মানুষকে বেশি লোভনীয় করে তোলে।

মানুষের শরীর হতে ৩০০ থেকে প্রায় ১ হাজার ভিন্ন ভিন্ন গন্ধযুক্ত যৌগ নির্গত হয়। কোন যৌগগুলো মশাকে আকর্ষণ করে, তা জানতে সম্প্রতি রিকার্ড ইগনেলসহ একদল বিজ্ঞানী গবেষণাগারে ৪২ জন নারীকে রেখে এডিস ইজিপ্টি প্রজাতির মশা ছেড়ে দেন। এই মশা পীত জ্বর ও ডেঙ্গু ছড়ানোর জন্য পরিচিত। বিজ্ঞানীরা দেখতে চেয়েছিলেন মশা কোন নারীদের বেশি পছন্দ করে। রিকার্ড ইগনেল বলেন, ‘আমরা দেখছি মশা আমাদের প্রতি আকৃষ্ট হতে গন্ধযুক্ত যৌগের একটি মিশ্রণ ব্যবহার করে। আমরা সম্ভাব্য ১০০০টি যৌগের মধ্যে ২৭টি যৌগ চিহ্নিত করেছি, যা মশা শনাক্ত করতে পারে। মশারা যে নারীদের বেশি কামড়াতে পছন্দ করেছিল, তাদের শরীরে একটি বিশেষ যৌগ বেশি উৎপন্ন হয়েছিল। ত্বকের তেল বা সিবাম ভেঙে এই যৌগ তৈরি হয়। এই যৌগের নাম ১-অকটেন-৩-অল বা মাশরুম অ্যালকোহল।

রিকার্ড ইগনেল জোর দিয়ে বলেন, এই যৌগের সামান্য বৃদ্ধি মশার আকর্ষণে বড় পার্থক্য তৈরি করে। মশারা সত্যিই চমৎকার প্রাণী। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে মশার বিস্তারের এলাকা বাড়ছে। তাই মশা কেন নির্দিষ্ট মানুষকে পছন্দ করে, তা জানা এখন জরুরি হয়ে উঠেছে। যেমন চিকুনগুনিয়া ভাইরাসের বাহক টাইগার মশা এখন নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। গত বছর চিকুনগুনিয়া রোগ প্রথমবারের মতো ফ্রান্সের উত্তরের আলসেস অঞ্চলে পৌঁছেছে। এই ঝুঁকি এখন আরও বেশিসংখ্যক মানুষকে প্রভাবিত করছে।

সূত্র: এএফপি