পুরোনো সংবাদ বিশ্লেষণ করে আকস্মিক বন্যার পূর্বাভাস দেবে গুগল
বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে প্রাণঘাতী প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর একটি আকস্মিক বন্যা। প্রতিবছর এ ধরনের বন্যায় পাঁচ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। কিন্তু এই বন্যা কখন ও কোথায় ঘটতে পারে, তা নির্ভুলভাবে আগাম পূর্বাভাস দেওয়া অত্যন্ত কঠিন। এই জটিল সমস্যার সমাধানে এবার ভিন্নধর্মী পদ্ধতি ব্যবহার করছে প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান গুগল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পুরোনো সংবাদ প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে আকস্মিক বন্যার সম্ভাব্য ঝুঁকি নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
আবহাওয়া–সংক্রান্ত তথ্যসংগ্রহের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত কিংবা নদীর পানিপ্রবাহের মতো অনেক তথ্য নিয়মিতভাবে পরিমাপ ও সংরক্ষণ করা সম্ভব। কিন্তু আকস্মিক বন্যা সাধারণত খুব অল্প সময়ের মধ্যে ঘটে এবং সীমিত ভৌগোলিক এলাকায় প্রভাব ফেলে। ফলে এ ধরনের ঘটনার নির্ভরযোগ্য তথ্য ধারাবাহিকভাবে সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই তথ্যঘাটতির কারণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ‘ডিপ লার্নিং’ মডেলগুলোও এত দিন এই বন্যার সঠিক পূর্বাভাস দিতে পারছিল না। এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে গুগলের গবেষকেরা ব্যবহার করেছেন প্রতিষ্ঠানের বৃহৎ ভাষা মডেল জেমিনি। এর মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রায় ৫০ লাখ সংবাদ প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এসব প্রতিবেদনের মধ্য থেকে ২৬ লাখের বেশি পৃথক বন্যাসংক্রান্ত ঘটনার তথ্য শনাক্ত করা হয়। পরে সেসব তথ্য সময় ও ভৌগোলিক অবস্থানের ভিত্তিতে সাজিয়ে একটি ডেটাসেট তৈরি করা হয়েছে। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘গ্রাউন্ডসোর্স’।
গুগল রিসার্চের পণ্য ব্যবস্থাপক গিলা লোইক জানিয়েছেন, এ ধরনের গবেষণায় প্রথমবারের মতো ভাষা মডেল ব্যবহার করেছে প্রতিষ্ঠানটি। গবেষণাটি এবং সংশ্লিষ্ট ডেটাসেট সম্প্রতি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। গ্রাউন্ডসোর্স ডেটাসেটকে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করে গবেষকেরা একটি পূর্বাভাস মডেল তৈরি করেছেন। একটি বিশেষ নিউরাল নেটওয়ার্ক বা এলএসটিএম প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই মডেল বৈশ্বিক আবহাওয়ার পূর্বাভাস বিশ্লেষণ করে নির্দিষ্ট কোনো এলাকায় আকস্মিক বন্যা ঘটার সম্ভাবনা নির্ধারণ করতে পারে। গুগলের এই মডেল বর্তমানে বিশ্বের ১৫০টি দেশের শহরাঞ্চলে সম্ভাব্য বন্যা ঝুঁকি চিহ্নিত করছে। প্রতিষ্ঠানটির ‘ফ্লাড হাব’ প্ল্যাটফর্মে এসব তথ্য প্রদর্শন করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জরুরি সাড়া প্রদানকারী সংস্থার সঙ্গেও তথ্যগুলো শেয়ার করা হচ্ছে। ফলে দুর্যোগ মোকাবিলায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে।
দক্ষিণ আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট কমিউনিটির কর্মকর্তা আন্তোনিও জোসে বেলেজা জানিয়েছেন, পরীক্ষামূলকভাবে এই মডেল ব্যবহারের ফলে বন্যা পরিস্থিতিতে তাদের সংস্থা দ্রুত সাড়া দিতে সক্ষম হয়েছে।
তবে প্রযুক্তিটির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মডেলটি তুলনামূলক কম রেজোল্যুশনে কাজ করে। প্রায় ২০ বর্গকিলোমিটার এলাকা ধরে এটি বন্যার সম্ভাব্য ঝুঁকি নির্ধারণ করতে পারে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় আবহাওয়া সেবার বন্যা সতর্কতা ব্যবস্থার তুলনায় এটি কম নির্ভুল। কারণ, গুগলের এই মডেলে স্থানীয় রাডার তথ্য ব্যবহার করা হয় না, যা বাস্তব সময়ে বৃষ্টিপাত পর্যবেক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবে যেসব দেশে আধুনিক আবহাওয়া পরিকাঠামো বা পর্যাপ্ত তথ্য নেই, সেসব দেশের কথা মাথায় রেখেই প্রকল্পটি সাজানো হয়েছে। গুগলের রেজিলিয়েন্স দলের কর্মসূচি ব্যবস্থাপক জুলিয়েট রথেনবার্গ বলেন, লাখো সংবাদ প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে তৈরি করা গ্রাউন্ডসোর্স ডেটাসেট বৈশ্বিক তথ্যমানচিত্রে নতুন ভারসাম্য আনতে সহায়তা করছে। ফলে এমন অনেক অঞ্চলের জন্যও বন্যার সম্ভাবনা নির্ধারণ করা সম্ভব হচ্ছে, যেখানে আগে পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যেত না।
রথেনবার্গের মতে, লিখিত বর্ণনামূলক তথ্য বিশ্লেষণ করে বড় ভাষা মডেলের মাধ্যমে পরিমাপযোগ্য ডেটাসেট তৈরির এই পদ্ধতি ভবিষ্যতে অন্যান্য দুর্যোগের ক্ষেত্রেও কাজে লাগতে পারে। যেমন তাপপ্রবাহ বা ভূমিধসের মতো স্বল্পস্থায়ী কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক ঘটনার পূর্বাভাস উন্নত করতে এ প্রযুক্তি সহায়ক হতে পারে।
নদীর পানিপ্রবাহের পূর্বাভাস দিতে গভীর শিক্ষণ প্রযুক্তি ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠান আপস্ট্রিম টেকের প্রধান নির্বাহী মার্শাল মাউটেনট বলেন, আবহাওয়া–সংক্রান্ত গবেষণায় নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাব এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। তাঁর মতে, ভূ–পদার্থবিদ্যার গবেষণায় তথ্যসংকট অন্যতম বড় সমস্যা। মাউটেনটের ভাষ্য, পৃথিবী–সম্পর্কিত বিপুল তথ্য থাকা সত্ত্বেও বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করার মতো নির্ভরযোগ্য তথ্য অনেক সময় পাওয়া যায় না। সেই দিক থেকে সংবাদ প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে তথ্যসংগ্রহের গুগলের এই উদ্যোগকে তিনি তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
সূত্র: টেকক্রাঞ্চ