স্মার্ট টেকনোলজিস বাংলাদেশে অনার স্মার্টফোনের কারখানা করল । চীনের বাইরে তৃতীয় দেশ হিসেবে বাংলাদেশে এই কারখানা। কারখানার উৎপাদনের তুলনায় বাংলাদেশের বাজার কি রয়েছে? শুরুতে উৎপাদন কত?
মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম: বাংলাদেশে স্মার্টের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে অনার কারখানা করেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে আমাদের এ প্রক্রিয়া শুরু হয়। তারপর অনুমোদন, যন্ত্রপাতি সেটআপ করতে করতে নভেম্বর মাসে কারখানা তৈরি শেষ হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে অনারের কারখানা চালু করি। আমার মনে হয়, আমরা দ্রুততম সময়ের মধ্যে কারখানাটি চালু করতে পেরেছি। এ কারখানার স্মার্টফোন উৎপাদনের ক্ষমতা প্রতি মাসে ৬০ হাজারের বেশি। এখন যেহেতু অনারের মার্কেট শেয়ার বেশি না, তাই এ মুহূর্তে প্রতিমাসে ৩০ থেকে ৪০ হাজার স্মার্টফোন আমরা তৈরি করব। একটি কারখানায় মান ঠিক রেখে স্মার্টফোন তৈরি করতে হয়। আমরা যেহেতু মানের (কোয়ালিটি) ব্যাপারে খুবই সচেতন, তাই মান ঠিক রেখে ধীরে ধীরে উৎপাদন বাড়াচ্ছি।
প্রযুক্তির দিক থেকে অনার ফোন কতটা উন্নত? বাংলাদেশে মার্কেট শেয়ার কত?
মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম: অনারের ফোন প্রযুক্তির দিক থেকে অন্যদের তুলনায় এগিয়ে আছে। আপনি জানেন যে অনার একসময় হুয়াওয়ে মোবাইলের অংশ ছিল। মান বলেন, আর অ্যান্ড ডি (গবেষণা ও উন্নয়ন) বলেন, সবকিছুই হুয়াওয়ের সমতুল্য অনারের ফোন। আর হুয়াওয়ের ফোন যে ভালো, তা সব সময় ছিল এবং এখনো আছে। তাই অন্য যারা ভালো ফোন তৈরি করে, অনারের ফোন তাদের সমতুল্য এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে এগোনো। আমাদের ফোনের ফিচার ও বিশেষ করে হার্ডওয়্যার অন্যদের তুলনায় নিঃসন্দেহে ভালো। বাংলাদেশে যেহেতু আমরা সবে শুরু করলাম, তাই এখন আমাদের মার্কেটশেয়ার কম। তবে দ্রুত বাজারে আমাদের অবস্থান ভালো হচ্ছে।
প্রথম আলো :
স্মার্ট টেকনোলজিস কয়টা ব্র্যান্ডের পণ্য আমদানি করে? দেশে কি কোনো প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদন করেন, নাকি সব আমদানিনির্ভর?
মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম: ৮৫টি ব্র্যান্ডের কম্পিউটার পণ্য আমদানি করে স্মার্ট টেকনোলজি। এর মধ্যে পাঁচ–ছয়টি আমরা উৎপাদন করি।
কম্পিউটার পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে প্রধান বাধা এখন কী?
মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম: কম্পিউটার এখন আর ভোগ্যপণ্য বা লাক্সারিয়াস পণ্য নয়। শুল্ক ও কর এখন যেভাবে আছে; আমি মনে করি, এটা কমানো উচিত। গ্রাহকের হাতে আরও সাশ্রয়ীভাবে কম্পিউটার পৌঁছানো গেলে ভালো হবে। শুল্ক ও করের ব্যাপারে সরকারের নতুন করে চিন্তা করা উচিত। আমদানিতে কোনো বাধা নেই, বাধা যেটা আছে, সেটি বাজারের ভেতরে শুল্ক ও ভ্যাট। আরেকটি বিষয় হচ্ছে বাজারে অনেক নকল পণ্য, পুরোনো পণ্য ও আমদানিনিষিদ্ধ পণ্য রয়েছে। আমদানি হচ্ছে যেসব পণ্য, সেগুলোর যথাযথ মনিটরিং ও কাস্টমসের যে যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা দরকার, সেটি আমরা দেখছি না। কাস্টমসের যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাস্তবায়নের জন্য আমরা সরকারের কাছে অনুরোধ জানিয়ে আসছি বারবার।
বাংলাদেশের কম্পিউটারের বাজার এখন কত বড়? প্রতি মাসে কত কম্পিউটার বিক্রি হয়?
মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম: ডেস্কটপ ও ল্যাপটপ মিলে প্রতি মাসে এখন ৩৫ থেকে ৪০ হাজার কম্পিউটার বিক্রি হয়। আমাদের পিসি (পারসোনাল কম্পিউটার) বাজারে পেনিট্রেশন কম। এখনো প্রতিবছর ১০ শতাংশের চেয়ে কম। আমাদের আশপাশের দেশে আপনি দেখবেন এ হার বেশি। বুদ্ধিমান সমাজ (ইন্টেলিজেন্ট সোসাইটি) গড়ে তুলতে কম্পিউটারের বাজার বড় করা ছাড়া সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সভাপতি হয়েছেন ছয় মাসের বেশি সময় হলো। এই ছয় মাসে কম্পিউটার শিল্পের কী উন্নতি হয়েছে?
মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম: ছয় মাসের মধ্যে সরকারে সঙ্গে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আমরা কাজ শুরু করেছি। এ সময়ের মধ্যে কম্পিউটার শিল্পের যে উন্নতি সাধন করা দরকার, তা বিভিন্ন বাধার কারণে হচ্ছে না। আপনি জানেন, এই সময়টাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো না, ঢাকা শহরসহ সারা বাংলাদেশ একটি আন্দোলনের দেশ হয়ে উঠেছে—এসব কারণে ব্যবসার পরিবেশ কিন্তু যথেষ্ট বাধাগ্রস্ত। বেসরকারি ব্যবসায় স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ একদম তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। বিভিন্ন ব্যাংকের পরিস্থিতিও খারাপ, ব্যাংকগুলোর এ পরিস্থিতি থেকে উন্নতি সাধন করা উচিত। তথাপি কম্পিউটারের বাজার কিন্তু ছোট হয়ে আসেনি। এখন আমরা চেষ্টা করছি সরকারের সঙ্গে নেগোশিয়েট করতে। সরকারের দশমিক ৫ শতাংশ কম্পিউটারাইজেশনের জন্য যে বরাদ্দ আছে, তা যেন আগামী বাজেটে বাড়ানো হয়। অন্যান্য দেশের সঙ্গে তাল মেলাতে কম্পিউটারাইজশনের বিকল্প নেই। অন্যদিকে বিসিএস ২৯ থেকে ৩১ জানুয়ারি বাংলাদেশের ইতিহাসে কম্পিউটার ও ডিজিটাল ডিভাইসের সবচেয়ে বড় প্রদর্শনীর আয়োজন করতে যাচ্ছে। আমরা আশা করছি, প্রধান উপদেষ্টা এই প্রদর্শনীর উদ্বোধন করবেন।
এনইআইআর (ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেনটিটি রেজিস্টার) বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে, এতে কীভাবে গ্রাহকেরা লাভবান হবেন? কম দামে স্মার্টফোন পাবেন, নাকি দাম বাড়বে?
মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম: এনইআইআর বাস্তবায়ন হচ্ছে, তাতে আমাদের গ্রাহকেরাই সবচেয়ে লাভবান হবেন। দাম বাড়বে না কমবে, তা এক পাশে সরিয়ে রেখে বলি—দাম তো বাড়বেই না; বরং কত কমবে তা দেখা যাবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো এনইআইআর বাস্তবায়নে গ্রাহক সঠিক দামে সঠিক পণ্যটি কিনতে পারবেন। প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কা একদম কমে যাবে। ফোনটি নকল না আসল তা আগে বোঝার সুযোগ একদমই ছিল না। আর গ্রাহকের ফোনের ও তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। একটি এনআইডির বিপরীতে অনেক সিম ব্যবহৃত হচ্ছে, সেটি বন্ধ হবে। একটি ফোনের আইএমইআই (ইন্টারন্যাশনাল মোবাইল ইকুইপমেন্ট আইডেনটিটি) নম্বরে অসংখ্য মোবাইল যে বিক্রি হচ্ছে, তা বন্ধ হবে। তার মানে প্রত্যেক গ্রাহকের যে আইডেনটিটিফিকেশন নম্বর, তা আলাদা থাকবে। প্রতারক চক্রের প্রতারণার শিকার হওয়ার আশঙ্কা একদম কমে যাবে। আমার মনে হয় গ্রাহকেরাই সবচেয়ে বেশি লাভবান হবেন, আমরা তাদের সুরক্ষা দিতে পারব। যাঁরা সঠিক চ্যানেলে ফোন বিক্রি করেন, অন্যদিকে কারখানায় মোবাইল ফোন উৎপাদন বেড়ে গেলে প্রতি ফোনে খরচ কমে আসবে। কারণ, উৎপাদন বাড়লে কিন্তু ফোন তৈরির যন্ত্রপাতির খরচ তেমন বাড়ে না। ফলে গ্রাহকের কম দামে আসল ও সঠিক ফোনটি পাবেন।
এনইআইআর নিয়ে এখনো ক্ষুব্ধ মোবাইল ব্যবসায়ীরা। তাঁরা যদি ধর্মঘটে যান, তবে আপনাদের সেট বিপণনে সমস্যা হবে কি না?
মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম: এনইআইআর নিয়ে যে আন্দোলন হচ্ছে; আমার মনে হয়, সেটি একটি ভুল ধারণার ওপর ভিত্তি করে হচ্ছে। এ সময়ে আন্দোলনে যে ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে, তাতে আমাদের খুবই সমস্যা হচ্ছে। তাঁরা দোকান বন্ধ রাখছেন; যে কারণে বিক্রি বন্ধ,আমাদের পণ্য বিপণন করতে পারছি না, ফলে কারখানাও বন্ধ রাখতে আমরা বাধ্য হয়েছি। আমরা ক্ষতিগ্রস্ত। এনইআইআর–ব্যবস্থা বাস্তবায়নের ফলে উপকার কিন্তু সবাই পাবেন। বিশেষ করে গ্রাহকেরা বেশি উপকৃত হবেন। সরকার এতে উপকৃত হবে, কারখানা ও আমাদের খুচরা বিক্রেতারাও উপকৃত হবে। এই ধর্মঘটের জন্য আমরা যে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি, এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আমরা সবার সহযোগিতা চাই। যে ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে আন্দোলন ত্বরান্বিত করা হয়েছে, এ জায়গা থেকে পুরো জাতিকে আমাদের বের করে আনতে হবে। আশা করি, শিগগিরই আমরা এ অচলাবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে পারব।
বলা হয়, একটি সিন্ডিকেট করে এনইআইআর বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এই সিন্ডিকেটের বিষয়টা কী?
মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম: দেখুন সিন্ডিকেটের বিষয়টি একেবারেই মিথ্যা একটি অপবাদ। এটা একদমই অসত্য। আপনি দেখবেন বাংলাদেশে ফোন তৈরির ১৮-১৯টার মতো কারাখানা চলছে। প্রতিটিই একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে ফোনের দাম কমিয়ে দিচ্ছে। এখানে সিন্ডিকেট হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এসব অপব্যাখ্যার কারণে আজ আমাদের বিভিন্ন সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এই অপব্যাখ্যা আপনারা মূলধারার গণমাধ্যমই দূর করতে পারবে। কারণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দিয়ে সারা দেশে অপব্যাখ্যাগুলো ছড়ায়।
আগামী পাঁচ বছরে স্মার্ট টেকনোলজিসকে কোথায় দেখতে চান? ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম: স্মার্ট টেকনোলজিসকে আগামী পাঁচ বছরে এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানি ও উৎপাদক হিসেবে দেখতে চাই। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হলো আমরা যদি তথ্যপ্রযুক্তি সেবা ও কিছু হার্ডওয়্যার রপ্তানি করতে পারি, তবে আমদানিনির্ভর জিডিপি থেকে বের হয়ে আসতে পারব। তথ্যপ্রযুক্তি সেবা খাতে স্মার্ট টেকনোলজিসকে একটি সহায়ক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে চাই। আগামী পাঁচ বছরে সেই লক্ষ্য পূরণে আমরা দিনরাত কাজ করে যাচ্ছি।
সাক্ষাৎকারের একদম শেষ পর্যায়ে আমরা—একটু ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা বলি। আপনার আগে শখ ছিল মাউন্টেনিয়ারিং। এখনো সে শখ আছে? পাশাপাশি আপনার শখ কী কী? অবসরে কী করতে ভালোবাসেন?
মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম: মাউন্টেনিয়ারিংয়ের শখ এখনো আমার আছে। তবে কাজের চাপে যেতে পারি না। সর্বশেষ গিয়েছিলাম কেওক্রাডং পাহাড়ের চূড়ায়। এখনো ইচ্ছা আছে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে দেশ ও বিদেশের পর্বতে যাওয়ার। মাউন্টেনিয়ারিংয়ের বাইরে আমার শখ হলো গ্রামের রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো, গ্রামের মানুষদের সঙ্গে মেশা, তাঁরা যে কৃষিকাজ করেন, গাছ লাগান, তা দেখা। পাশাপাশি প্রাণীদের বিষয়ে আমার আগ্রহ আছে। আমি বিড়াল পুষি ও পছন্দ করি। আমার ইচ্ছা হলো কৃষিকে নতুন প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয় করা। আমার আরেকটি শখ হলো ছাদবাগান করা। আমি ছাদবাগান করে ফল ও সবজি ফলাই।
আপনাকে ধন্যবাদ।
মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম: আপনাকেও ধন্যবাদ।