বাংলাদেশ দ্রুত এক নতুন বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে, যেখানে নাগরিক সেবা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যাংকিং ও ব্যবসার বড় একটি অংশই নির্ভর করছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ওপর। মুঠোফোনের পর্দায় ব্যাংকিং লেনদেন, অনলাইনে সরকারি ফরম পূরণ, ভার্চ্যুয়াল ক্লাস কিংবা ই–কমার্স—সবকিছুর পেছনে কাজ করছে এক বিশাল অদৃশ্য অবকাঠামো—ডেটা। এই ডেটা কোথায় রাখা হচ্ছে, কীভাবে সুরক্ষিত রাখা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে তা কতটা টেকসই হবে, এই প্রশ্নগুলো এখন নীতিনির্ধারকদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বজুড়ে আলোচিত একটি ধারণা হলো, ক্লাউড ফার্স্ট কৌশল। বাংলাদেশেও এই কৌশল বাস্তবায়নের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে ডেটা সেন্টার স্থাপন ও সম্প্রসারণের বিষয়টি।
ক্লাউড ফার্স্ট কী—সহজ করে বোঝা যাক
ক্লাউড ফার্স্ট কৌশল বলতে বোঝায়, নতুন কোনো ডিজিটাল সেবা বা তথ্যব্যবস্থা চালুর সময় প্রথমেই ক্লাউড প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা বিবেচনা করা। অর্থাৎ নিজস্ব সার্ভার, হার্ডওয়্যার বা ডেটা সংরক্ষণের ব্যবস্থা গড়ে তোলার আগে অনলাইন ক্লাউড অবকাঠামো ব্যবহার করা। আগে কোনো প্রতিষ্ঠান চাইলে নিজেদের তথ্য সংরক্ষণের জন্য আলাদা সার্ভার কিনত, সার্ভার রুম বানাত, বিদ্যুৎ ও কুলিংয়ের ব্যবস্থা করত এবং নিরাপত্তার জন্য অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ দিত। ক্লাউড প্রযুক্তি সেই জটিলতা অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে। এখন প্রয়োজন অনুযায়ী অনলাইন থেকেই কম্পিউটিং শক্তি, স্টোরেজ ও সফটওয়্যার ব্যবহার করা যায়। সহজভাবে বললে, যেমন আমরা নিজে বিদ্যুৎ উৎপাদন না করে বিদ্যুৎ অফিস থেকে সরবরাহ করা বিদ্যুৎ ব্যবহার করি, ক্লাউড প্রযুক্তিও ঠিক তেমনই, নিজে অবকাঠামো না বানিয়ে প্রয়োজনীয় ডিজিটাল সুবিধা ব্যবহার করা।
ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল ব্যবস্থার নীরব কারখানা
ডেটা সেন্টার হলো অত্যাধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন এমন একটি স্থাপনা, যেখানে হাজার হাজার শক্তিশালী কম্পিউটার বা সার্ভার একসঙ্গে কাজ করে। এই সার্ভারগুলোর মধ্যেই সংরক্ষিত থাকে নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য, ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবার লেনদেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ডেটা।
ডেটা সেন্টারগুলোয় থাকে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, উন্নত কুলিংয়ের ব্যবস্থা, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ও সর্বোচ্চ পর্যায়ের নিরাপত্তা। আধুনিক ডিজিটাল সেবা কার্যকরভাবে চালু রাখতে এসব কেন্দ্র অপরিহার্য।
কেন বাংলাদেশে ডেটা সেন্টার এখন সময়ের দাবি
ডেটা দেশের ভেতরে রাখার প্রয়োজন। বর্তমানে বাংলাদেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বিদেশি সার্ভারে সংরক্ষিত। এতে তথ্যের ওপর দেশের নিয়ন্ত্রণ সীমিত হয়ে পড়ে এবং জাতীয় নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। দেশীয় ডেটা সেন্টার হলে এই তথ্য দেশের ভেতরেই সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়।
দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল সেবা
ডেটা যদি দেশের বাইরে থাকে, তাহলে তথ্য আদান–প্রদানে সময় বেশি লাগে। এতে ওয়েবসাইট বা অ্যাপ ধীরগতির হয়। দেশীয় ডেটা সেন্টার ব্যবহারে ল্যাটেন্সি কমে এবং ডিজিটাল সেবার মান উন্নত হয়।
খরচ ও দক্ষতার বিষয়
বিদেশি সার্ভার ব্যবহার করলে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইডথের ওপর নির্ভরতা বাড়ে, যা ব্যয়বহুল। স্থানীয় ডেটা সেন্টার ব্যবহার করলে খরচ কমে এবং একই সঙ্গে দেশীয় তথ্যপ্রযুক্তি খাতের দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়ে।
সরকারের ক্লাউডভিত্তিক উদ্যোগ
সরকার এরই মধ্যে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। জাতীয় ডেটা সেন্টার স্থাপন, সরকারি সেবাগুলোকে অনলাইনে রূপান্তর ও বিভিন্ন দপ্তরে ক্লাউডভিত্তিক তথ্যব্যবস্থার ব্যবহার—এসব উদ্যোগ মূলত ক্লাউড ফার্স্ট ধারণারই বাস্তব প্রতিফলন। জন্মনিবন্ধন, পাসপোর্ট, ভূমি সেবা, কর ব্যবস্থাপনা—এসব সেবার ডিজিটাল রূপান্তরের পেছনে ডেটা সেন্টার ও ক্লাউড অবকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
বেসরকারি খাতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত
শুধু সরকারি নয়, বেসরকারি খাতেও ক্লাউড ও ডেটা সেন্টারের ব্যবহার বাড়ছে। ব্যাংক, টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান, সফটওয়্যার কোম্পানি ও স্টার্টআপগুলো ধীরে ধীরে দেশীয় অবকাঠামোর দিকে ঝুঁকছে। এর ফলে তৈরি হচ্ছে নতুন কর্মসংস্থান, বাড়ছে প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং শক্তিশালী হচ্ছে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি ইকোসিস্টেম। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এই ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক পর্যায়েও একটি ডেটা হাব হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
চ্যালেঞ্জগুলো কোথায়
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ডেটা সেন্টার স্থাপন ও পরিচালনার জন্য প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত বিদ্যুৎ, পরিবেশবান্ধব ও কার্যকর কুলিং প্রযুক্তি, শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তাব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত ক্লাউড ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ। পাশাপাশি এই খাতের টেকসই উন্নয়নের জন্য নীতিগত সহায়তা, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ জরুরি।
ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের পথচলা
বিশ্ব অর্থনীতি দ্রুত ডেটানির্ভর হয়ে উঠছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দিনে দেশে স্থানীয় ক্লাউড সার্ভিস ও ডেটা সেন্টারভিত্তিক ব্যবসার পরিসর আরও বাড়বে। আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ আকর্ষণ করাও সম্ভব হবে। একই সঙ্গে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে ক্লাউড কম্পিউটিং, ডেটাবিজ্ঞান ও সাইবার নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে।
শেষ কথা
ক্লাউড ফার্স্ট কৌশল কোনো বিলাসিতা নয়, এটি ডিজিটাল যুগে টিকে থাকার একটি বাস্তব প্রয়োজন। যে দেশ তার ডেটা নিরাপদভাবে সংরক্ষণ করতে পারে, দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল সেবা দিতে পারে ও নিজস্ব অবকাঠামোর ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখে, সেই দেশই ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকবে।
ড. তৌহিদ ভূঁইয়া: তথ্যপ্রযুক্তিবিদ ও ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির অধ্যাপক