সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার আসক্তি না অভ্যাস, কমানোর উপায় কী
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত নির্ভরশীলতাকে অনেক বিশেষজ্ঞ জুয়া, ওপিওয়েড (মরফিন, কোডিন) বা সিগারেটের আসক্তির সঙ্গে তুলনা করে থাকেন। যদিও ‘অতিরিক্ত ব্যবহার’ আর ‘আসক্তি’র সীমারেখা নিয়ে এখনো বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিতর্ক আছে, তবু একটি বিষয় স্পষ্ট যে অনেকেই ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, স্ন্যাপচ্যাটসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের আকর্ষণ থেকে সহজে বেরিয়ে আসতে পারছেন না।
প্ল্যাটফর্মগুলোর নকশা মূলত ব্যবহারকারীদের দীর্ঘ সময় যুক্ত রাখাকে প্রাধান্য দিয়ে তৈরি করা হয়। কারণ, ব্যবহারকারীরা যত বেশি সময় থাকবেন, বিজ্ঞাপন দেখানোর সুযোগ তত বাড়বে আর সেখান থেকেই প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব নিয়ে আলোচনা সাধারণত শিশু-কিশোরদের ঘিরে হলেও প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিরাও এর বাইরে নন। অনেকের ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত ব্যবহার দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলতে শুরু করে।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব মেডিসিনের অ্যাডিকসন মেডিসিন বিভাগের পরিচালক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আনা লেমকের মতে, ক্ষতি জেনেও কোনো পদার্থ বা আচরণের প্রতি অব্যাহত ও নিয়ন্ত্রণহীন নির্ভরশীলতাই হচ্ছে আসক্তি। তবে কিছু গবেষকের মতে, ‘আসক্তি’ শব্দটি ব্যবহারের আগে সতর্ক হওয়া দরকার। তাঁদের যুক্তি, আসক্তি বলতে তীব্র আকাঙ্ক্ষা বা ব্যবহার বন্ধ করলে অস্বস্তির নির্দিষ্ট উপসর্গ থাকা জরুরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় দেওয়া মানেই যে তা চিকিৎসাবিজ্ঞানের সংজ্ঞায় আসক্তি, এমন ঐকমত্য এখনো গড়ে ওঠেনি। মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক মানদণ্ড নির্ধারণে ব্যবহৃত ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিক্যাল ম্যানুয়াল অব মেন্টাল ডিসঅর্ডার্সেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আসক্তিকে আনুষ্ঠানিক রোগ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। তবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না থাকলেও অতিরিক্ত ব্যবহার যে ক্ষতিকর হতে পারে, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের আপত্তি নেই।
বেইলর কলেজ অব মেডিসিনের মনোরোগ ও বিহেভিরিয়াল সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক লরেল উইলিয়ামস বলেন, একজন ব্যক্তি নিজেই যদি অনুভব করেন যে তিনি প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সময় দিচ্ছেন এবং এর ফলে কাজ, পড়াশোনা, শখ বা সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, সেটিই সমস্যার বড় লক্ষণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের পর যদি নিয়মিতভাবে ক্লান্ত, উদ্বিগ্ন, হতাশ বা রাগান্বিত লাগে, তবে সেটিও সতর্কবার্তা। নিজেকে প্রশ্ন করা যেতে পারে, কাজ ফেলে কি বারবার ফোন হাতে নিচ্ছেন? সময় কমানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছেন? ব্যবহারের জন্য অপরাধবোধ হচ্ছে? যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তবে ব্যবহার পুনর্বিবেচনা করা জরুরি।
আসক্তি কমানোর উপায় কী
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অতিরিক্ত ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের প্রথম ধাপ হচ্ছে সচেতনতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ফিড ও বিজ্ঞাপন কীভাবে ব্যবহারকারীর মনোযোগ ধরে রাখে, তা বোঝা জরুরি। মনে রাখতে হবে, এগুলো মূলত বাণিজ্যিক প্ল্যাটফর্ম। সব তথ্য বিশ্বাসযোগ্য বা জরুরি নয়। বিকল্প ও নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্রে নজর বাড়ানোও সহায়ক হতে পারে। ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির গবেষক ইয়ান এ অ্যান্ডারসনের পরামর্শ, ছোট কিন্তু অর্থবহ পরিবর্তন দিয়ে শুরু করা যেতে পারে। যেমন ফোনের হোম স্ক্রিনে অ্যাপের অবস্থান বদলে দেওয়া, অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা বা শোবার ঘরে ফোন না নেওয়া। এই ‘হালকা’ পদক্ষেপগুলোও ব্যবহার কমাতে সাহায্য করতে পারে। প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও আছে। আইফোন ও অ্যান্ড্রয়েড দুই ধরনের স্মার্টফোনেই স্ক্রিন টাইম বা ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের সুবিধা রয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ফোনের ব্যবহার সীমিত করা, নির্দিষ্ট অ্যাপ বা অ্যাপের শ্রেণিতে সময়সীমা নির্ধারণ করা সম্ভব। যদিও এসব সীমা অতিক্রম করা কঠিন নয়, তবু এটি ব্যবহারকারীদের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করে।
হালকা পদক্ষেপে কাজ না হলে তুলনামূলক কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। কেউ কেউ ফোনের রং গ্রে স্কেল বা সাদাকালো করে ব্যবহার করেন, যাতে দৃশ্যমান আকর্ষণ কমে যায়। আবার কেউ স্মার্টফোন ছেড়ে সাধারণ ফিচার ফোন ব্যবহার শুরু করেন। এ ছাড়া বাজারে এমন কিছু ডিভাইসও এসেছে, যা নির্দিষ্ট অ্যাপ খুলতে বাধা তৈরি করে। নির্দিষ্ট ট্যাগ বা প্লাস্টিকের ডিভাইস ছাড়া অ্যাপ চালু হয় না। এতে ব্যবহার করার আগে অন্তত একবার ভাবার সুযোগ তৈরি হয়। কেউ চাইলে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ফোন লকবাক্সেও রেখে দিতে পারেন। সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে বিষয়টিকে গভীরভাবে দেখা দরকার। অতিরিক্ত ব্যবহার অনেক সময় উদ্বেগ, একাকিত্ব, বিষণ্নতা বা আত্মসম্মানবোধের ঘাটতির মতো সমস্যার লক্ষণ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্ধুবান্ধব বা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটালে ফল ভালো হতে পারে। ধীরে ধীরে বাস্তব জীবনের পরিসর যত বাড়বে, ভার্চ্যুয়াল নির্ভরতা তত কমার সম্ভাবনা থাকবে।
সূত্র: নিউইয়র্ক পোস্ট