রেলগাড়িতে চড়ে এলাকা ছাড়ছে কিং কোবরা

ট্রেনফাইল ছবি: রয়টার্স

বন্য প্রাণী যখন তাদের স্বাভাবিক আবাসস্থল ছেড়ে লোকালয়ে চলে আসে, তখন সচরাচর আমরা বন ধ্বংস হওয়া বা জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করি। কিন্তু কিং কোবরার মতো বিশালাকার সাপের লোকালয়ে চলে আসার ভিন্ন একটি কারণ খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

সরীসৃপ বিশেষজ্ঞ দিকংশ পারমার ও তাঁর দলের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় চাঞ্চল্যকর এক তথ্য জানা গেছে। বায়োট্রপিকা সাময়িকীতে প্রকাশিত ‘স্নেকস অন ট্রেনস: রেলওয়েজ মে সোয়ে গোয়াস কিং কোবরা ডিস্ট্রিবিউশন’ শীর্ষক গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, ভারতের বিশাল রেল যোগাযোগব্যবস্থা অজান্তেই এই হিংস্র শিকারি সাপকে তাদের চিরচেনা বনভূমি থেকে অনেক দূরে বহন করে নিয়ে যাচ্ছে।

ভারতের গোয়া রাজ্যে গত দুই দশকের উদ্ধার হওয়া কিং কোবরার তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন তথ্য জানা গেছে। গোয়ায় মোট ৪৭টি স্থান থেকে সাপ উদ্ধার করা হয়েছিল। এর মধ্যে পাঁচটি স্থান ছিল কিং কোবরার বসবাসের জন্য সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত। এ পাঁচটি স্থানই ছিল রেললাইন বা রেলস্টেশনের কয়েক শ মিটারের মধ্যে। একটি সাপ বনভূমি থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দূরে ভারতের গোয়ায় ভাস্কো দা গামা বন্দরে পাওয়া যায়, যেখানে ট্রেনের সরাসরি সংযোগ রয়েছে।

বন থেকে অনেক দূরে বর্ষণমুখর বনের পরিবর্তে জনবহুল শহরে সাপের এই উপস্থিতির কারণ হিসেবে বিজ্ঞানী পারমার মনে করেন, বিভিন্ন সাপ হয়তো আশ্রয় বা খাবারের খোঁজে ট্রেনের কামরায় ঢুকে পড়ে। বিশেষ করে পণ্যবাহী ওয়াগনগুলোয় ইঁদুরের উপদ্রব বেশি থাকায় শিকারের লোভে সেখানে সাপগুলো লুকিয়ে থাকে। ট্রেনের মাধ্যমে সাপের এই স্থানান্তরের ঘটনাটি বিরল মনে হলেও এটি আসলে আশঙ্কাজনক। দিকংশ পারমার জানান, বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রেনে সাপ দেখার খবর আগের চেয়ে অনেক বেশি রিপোর্ট করা হচ্ছে। অনিচ্ছাকৃত এই স্থানান্তরের ফলাফল ভয়াবহ হতে পারে। কিং কোবরার টিকে থাকার জন্য নির্দিষ্ট পরিবেশ, শিকার ও বিশেষ জলবায়ুর প্রয়োজন হয়। অনুপযুক্ত পরিবেশে চলে আসায় তাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ব্যাপকভাবে কমে যায়।

বন্য প্রাণী ওয়ার্ডেন ও ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ইন্ডিয়ার উপস্থাপক বেনহেইল আন্তাও বলেন, ‘পরিবহন ব্যবস্থার সূচনালগ্ন থেকেই ট্রেন, জাহাজ বা ট্রাকের মাধ্যমে বন্য প্রাণীর এই অনিচ্ছাকৃত চলাচল ঘটে আসছে। আমরা কেবল সাপ নয়; বরং বিভিন্ন সরীসৃপ, পাখি, ব্যাঙ ও টিকটিকির ক্ষেত্রেও এটি দেখি। একবার পাহাড়ি বনের শীতল পরিবেশে অভ্যস্ত ব্যাম্বু পিট ভাইপার ম্যাপুসার মতো আর্দ্র এলাকায় পাওয়া গিয়েছিল, যা সম্ভবত ফলের ট্রাকের মাধ্যমে সেখানে পৌঁছেছিল। এমনকি যুক্তরাজ্যের টবে করে পাঠানো গাছের সঙ্গেও মাটির নিচের সাপ চলে যাওয়ার নজির রয়েছে।’

গবেষণার সহবিজ্ঞানী পি ডেনিস রডার সতর্ক করে বলেন, মানুষের তৈরি এই অবকাঠামোগত করিডর ভবিষ্যতে প্রজাতির ভৌগোলিক বিন্যাসকে ওলট–পালট করে দিতে পারে। এতে বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য নষ্টের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া