আদিম ব্ল্যাক হোলে সন্ধান মিলতে পারে পঞ্চম মাত্রার, দাবি বিজ্ঞানীদের

মহাবিশ্বে লুকিয়ে থাকা পঞ্চম মাত্রা বা ফাইভ ডাইমেনশনের রহস্য উন্মোচনের জন্য কাজ করছেন বিজ্ঞানীরাফাইল ছবি: নাসা

স্থান ও কালের পরিচিত চার মাত্রার বাইরে মহাবিশ্বে অতিরিক্ত কোনো মাত্রার অস্তিত্ব রয়েছে কি না, তা জানতে দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণা করছেন বিজ্ঞানীরা। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের লেহম্যান কলেজের একদল বিজ্ঞানী দাবি করেছেন, বিগ ব্যাংয়ের ঠিক পরপরই তৈরি হওয়া অতি ক্ষুদ্র আদিম ব্ল্যাক হোল বা প্রাইমর্ডিয়াল ব্ল্যাক হোল বিশ্লেষণ করে মহাবিশ্বে লুকিয়ে থাকা পঞ্চম মাত্রা বা ফাইভ ডাইমেনশনের সন্ধান মিলতে পারে। বিজ্ঞানীদের এ দাবি সত্য হলে মহাজাগতিক গঠন, অন্ধকার বস্তু বা ডার্ক ম্যাটার ও স্পেসটাইমের মৌলিক রহস্য উন্মোচনে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আমাদের দৃশ্যমান বিশ্ব দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা ও সময়সমন্বিত চার মাত্রার স্পেসটাইমে অবস্থিত হলেও বিজ্ঞানীরা মনে করেন, মহাবিশ্বের গঠন আরও জটিল হতে পারে। তাঁদের মতে, আমাদের চার মাত্রার মহাবিশ্ব মূলত একটি বড় পাঁচ মাত্রার মহাজাগতিক পেছনের পটভূমির ভেতরে অবস্থান করছে। একে বিজ্ঞানীরা ডার্ক ডাইমেনশন বা ‘বাল্ক’ নামে ডাকেন। বিজ্ঞানীরা ফিজিক্যাল রিভিউ ডি নামের আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, বিগ ব্যাংয়ের পরপরই তৈরি হওয়া ক্ষুদ্র প্রাইমর্ডিয়াল ব্ল্যাক হোল এ পঞ্চম মাত্রায় প্রবেশ করতে পারে। অতি ঘন এসব আদিম ধ্বংসাবশেষ আকারে এতই ছোট যে এদের অভিকর্ষ বল চার মাত্রার বাস্তবতা থেকে পাঁচ মাত্রার ডার্ক ডাইমেনশনে ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে যে আমাদের পরিচিত ফোর-ডি মহাবিশ্ব মূলত একটি কাঠামো যা পাঁচ মাত্রার বাল্কের ভেতর ভেসে আছে। বিজ্ঞানী লুইস এ অ্যানকোরদোকি, অ্যালেক বেদ্রোয়া ও ডিটার লুস্ট এ গবেষণা পরিচালনা করেন।

সাধারণ ব্ল্যাক হোল বিশালাকার নক্ষত্রগুলোর জ্বালানি শেষ হয়ে পতনের মাধ্যমে গঠিত হলেও প্রাইমর্ডিয়াল ব্ল্যাক হোল বিগ ব্যাংয়ের প্রথম সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে তৈরি হয়েছিল। বিজ্ঞানীদের দুটি প্রধান তত্ত্বের প্রথমটিতে বলা হয়েছে, আদি মহাবিশ্বের অতিরিক্ত ঘন পদার্থের পতন ঘটে চার মাত্রার আদিম ব্ল্যাক হোল গঠিত হলেও আকারে অত্যন্ত ছোট হওয়ার কারণে তা দ্রুত অস্থিতিশীল হয়ে পাঁচ মাত্রার বস্তুতে রূপান্তরিত হয়। দ্বিতীয় তত্ত্বে বলা হয়েছে, মহাবিশ্বের জন্মের সময় তৈরি হওয়া অতি পাতলা কসমিক স্ট্রিং নামক ওয়ান-ডি বা একমাত্রার কাঠামোর লুপ একত্র হয়ে সরাসরি পাঁচ মাত্রার আদিম ব্ল্যাক হোল তৈরি করেছিল। উভয় গণনাই নির্দেশ করছে, আমাদের মহাবিশ্বে কোনো অন্ধকার মাত্রা থাকলে বিদ্যমান প্রিমর্ডিয়াল ব্ল্যাক হোলগুলো মূলত পাঁচ মাত্রার বস্তু হিসেবেই টিকে রয়েছে।

বিজ্ঞানীদের তথ্যমতে, পাঁচ মাত্রার ব্ল্যাক হোলগুলো চার মাত্রার সাধারণ ব্ল্যাক হোলের তুলনায় অনেক ধীরে ধীরে বাষ্পীভূত হয়। কসমিক স্ট্রিং ভেঙে তৈরি হওয়া ব্ল্যাক হোলগুলোর আয়ুষ্কাল মহাবিশ্বের ১৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন বছরের সমান হতে পারে। এর অর্থ, এ ব্ল্যাক হোল আজও আমাদের চারপাশে অবস্থান করতে পারে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কণার বাষ্প তৈরি করে বিলীন হয়ে যেতে পারে। ২০২৩ সালে ভূমধ্যসাগরের গভীরে অবস্থিত কেএমথ্রিনেট ডিটেক্টরে আঘাত হানা রহস্যময় ভুতুড়ে কণা বা ঘোস্ট পার্টিকেলের উৎস পাঁচ মাত্রার কোনো আদিম ব্ল্যাক হোলের বাষ্পীভবন হতে পারে বলেও দাবি করেছেন বিজ্ঞানীরা।

যদিও প্রাইমর্ডিয়াল ব্ল্যাক হোলকে সরাসরি এখনো পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়নি, তবে মহাবিশ্বের ২৭ শতাংশ গঠনকারী রহস্যময় ডার্ক ম্যাটারের অন্যতম প্রধান দাবিদার হিসেবে এগুলোকে বিবেচনা করা হয়। যদি সত্যি এ অন্ধকার মাত্রার অস্তিত্ব থেকে থাকে, তাহলে আদিম ব্ল্যাক হোলসংক্রান্ত এ গবেষণা স্পেসটাইমের মৌলিক গঠন বুঝতে বিজ্ঞানীদের এক নতুন পথ দেখাবে।

সূত্র: ডেইলি মেইল