গোলাপি ডোরাকাটা রহস্যময় নতুন সামুদ্রিক উদ্ভিদের সন্ধান
মহাসমুদ্রের গভীরে লুকিয়ে থাকা জীবনের রহস্যময় বিবর্তন আজও মানুষকে অবাক করে থাকে। গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত পানির নিচের ইকোসিস্টেম হলেও যুক্তরাজ্যের নিজস্ব জলাশয়ে একটি প্রাচীন ও চমৎকার সামুদ্রিক রাজ্য লুকিয়ে আছে। এগুলোকে মার্ল বেড বলা হয়। প্রবালসদৃশ এই সামুদ্রিক উদ্ভিদের কার্পেটগুলো সমুদ্রের অন্যতম সমৃদ্ধ জীবনধারা বা আবাসস্থল তৈরি করে। প্রায় চার দশক আগে পিএইচডি গবেষণার অংশ হিসেবে একটি মার্ল বেড পর্যবেক্ষণ করার সময় যুক্তরাজ্যের গবেষক ক্রিস্টিন ম্যাগস গোলাপি ডোরাকাটা সামুদ্রিক উদ্ভিদ বা অ্যালগির ছোট একটি অংশ খুঁজে পেয়েছিলেন। গোলাপি ডোরাকাটা সামুদ্রিক উদ্ভিদ আগে দেখা না যাওয়ায় তা আবিষ্কারের জন্য গবেষণা শুরু করেন তিনি। অবশেষে তাঁর নিরলস সাধনা ও নিখুঁত বৈজ্ঞানিক সন্ধানের পর পানির নিচে এক অচেনা জগতের রহস্য উন্মোচিত হয়েছে।
মার্ল বেড দেখতে হুবহু প্রবালের মতো। তবে এগুলো হাজার হাজার ছোট ছোট চুনযুক্ত মুক্ত অ্যালগি বা সামুদ্রিক উদ্ভিদ, যা একসঙ্গে যুক্ত হয়ে সমুদ্রে জীবনের কার্পেট তৈরি করে। ক্রিস্টিন ম্যাগস নিশ্চিত হন যে গোলাপি ডোরাকাটা সামুদ্রিক উদ্ভিদটি সম্পূর্ণ নতুন একটি প্রজাতি। তবে এই প্রজাতিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিতে বড় নমুনার প্রয়োজন। আর তাই তিনি পিএইচডি শেষ করার পরও গবেষণা চালিয়ে যান। পুরো কর্মজীবনে আকারে ছোট সামুদ্রিক উদ্ভিদটির সংক্ষিপ্ত অংশের দেখা পেলেও প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করতে পারেননি তিনি।
দুই বছর আগে কর্নওয়ালের মার্ল বেডে ন্যাচারাল ইংল্যান্ড আয়োজিত এক জরিপে গোলাপি ডোরাকাটা সামুদ্রিক উদ্ভিদের নতুন নমুনা খুঁজে পাওয়া যায়। ক্রিস্টিন ম্যাগস নমুনাটির ডিএনএ বিশ্লেষণের জন্য বিশেষ ধরনের ফ্রিজ কেনেন। ফলে অন্ধকারে ঠান্ডা পরিবেশে উপযুক্ত তাপমাত্রা পেয়ে উদ্ভিদটি বেড়ে ওঠে। এর মাধ্যমে তিনি দীর্ঘ ৪০ বছর পর কাঙ্ক্ষিত তথ্য পেতে সক্ষম হন। এ বিষয়ে অধ্যাপক ক্রিস্টিন ম্যাগস বলেন, ‘আমরা জানতাম মার্ল বেড জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ, কিন্তু এর ওপরেও যে নতুন প্রজাতি খুঁজে পাওয়া যাবে, তা ভাবতে পারিনি। নতুন প্রজাতির উদ্ভিদটির বৈজ্ঞানিক নাম রাখা হয়েছে কেরামিয়াম রুয়েনেসিয়ানাম। তবে গবেষকেরা পিংক জেব্রিলা বা গোলাপি ডোরাকাটা অ্যালগি নামটি বেশি পছন্দ করেছেন।
মেরিন বায়োলজিস্ট ফ্রান্সিস বাংকার জানান, নতুন একটি প্রজাতি খুঁজে পাওয়া জীবনের সেরা প্রাপ্তি। এটি সত্যিই আপনাকে কাজের অনুপ্রেরণা দেয়। ন্যাচারাল ইংল্যান্ডের বিশেষজ্ঞ অ্যাঞ্জি গাল পানির নিচে কাজ করার অনুভূতি তুলে ধরে জানান, এমন জায়গায় ডাইভিং করতে যাওয়া অত্যন্ত সৌভাগ্যের এবং এর সৌন্দর্য দেখার জন্য কখনো পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায় না। প্রতিবারই এটি একদম নতুনরূপে সামনে আসে।
ট্রিনিটি কলেজের জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক ক্রেগ স্নাইডার মনে করেন, এই আবিষ্কার বিজ্ঞানের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি পরিবেশ সুরক্ষায় ভূমিকা রাখবে। সামুদ্রিক উদ্ভিদ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক জুলিয়েট ব্রোডি জানান, ‘আমাদের সামুদ্রিক উদ্ভিদের যত্ন নিতে হবে এবং এদের ভালোবাসতে হবে। সামুদ্রিক উদ্ভিদ ছাড়া পৃথিবীর কথা ভাবা যায় না। এগুলো হারিয়ে গেলে অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মাছের প্রজননকেন্দ্র হারিয়ে যাবে।’
সূত্র: বিবিসি