মঙ্গল গ্রহ থেকে আসা উল্কাপিণ্ডে বিরল খনিজের সন্ধান
মহাকাশের অসীম শূন্যতায় লুকিয়ে আছে নানা অজানা রহস্য। আমাদের প্রতিবেশী মঙ্গল গ্রহের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস সম্পর্কে জানতে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন বিজ্ঞানীরা। এবার পৃথিবীতে আছড়ে পড়া মঙ্গল গ্রহের একটি উল্কাপিণ্ডে মূল্যবান খনিজ পাওয়ার দাবি করেছেন তাঁরা। বিজ্ঞানীদের তথ্যমতে, মঙ্গল গ্রহ থেকে আসা উল্কাপিণ্ডটি ভেঙে অপ্রত্যাশিতভাবে মূল্যবান খনিজ গার্নেটের কণা পাওয়া গেছে। মঙ্গল গ্রহের কোনো নমুনায় এবারই প্রথম এই খনিজের সন্ধান মিলল। উল্কাপিণ্ডটি বর্তমানে কানাডার রয়্যাল ওন্টারিও মিউজিয়ামে রাখা হয়েছে।
পৃথিবীতে সাধারণত তীব্র তাপ, উচ্চ চাপ কিংবা রাসায়নিক পরিবর্তনের মাধ্যমে গার্নেট তৈরি হয়। আর তাই এই গার্নেট কি সত্যিই মঙ্গল গ্রহে তৈরি হয়েছে কি না বা কীভাবে তৈরি হয়েছে, তা জানতে আগ্রহী বিজ্ঞানীরা। এ বিষয়ে কানাডার ব্রক ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানী তানিয়া কিজোভস্কি বলেন, এই আবিষ্কার মঙ্গল গ্রহে সম্ভাব্য ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান বাড়াবে। গার্নেট যুক্ত এই নতুন ধরনের শিলা মঙ্গল গ্রহের ইতিহাসের পরিবর্তন সম্পর্কে সূত্র দিতে পারে। এটি প্রাচীন মঙ্গল গ্রহের পরিবেশ বিষয়েও নতুন তথ্য জানাতে পারে।
গার্নেট বলতে আমরা সাধারণত গাঢ় রক্ত-লাল রঙের একটি মূল্যবান রত্ন পাথর বুঝি। তবে মঙ্গল গ্রহের গার্নেটটি একদমই আলাদা। বিজ্ঞানীদের তথ্যমতে, অন্যান্য খনিজের মতো গার্নেট সব সময় চেনারূপে দেখা দেয় না। বিশেষ করে অ্যান্ড্রাডাইট নামের লোহাসমৃদ্ধ একধরনের গার্নেট রয়েছে, যা দেখতে হলদে-সবুজ বা জলপাই রঙের। উল্কাপিণ্ডে পাওয়া অন্যান্য সাধারণ খনিজের সঙ্গে এর মিল রয়েছে। এটি আলাদা করে চোখে পড়ে না। এই কারণে শুরুতে বিষয়টি প্রায় এড়িয়েই যাচ্ছিলেন বিজ্ঞানীরা। এ বিষয়ে তানিয়া কিজোভস্কি বলেন, উল্কাপিণ্ডের এই ছোট অংশটি দেখতে খুব আকর্ষণীয় ছিল। এটির রাসায়নিক গঠনও ছিল কিছুটা অদ্ভুত। প্রথমে আমরা এটিকে পাইরোক্সিন নামের একটি সাধারণ খনিজ ভেবেছিলাম। পরে আমরা এটিকে আরও ভালো করে দেখার সিদ্ধান্ত নিই। পরবর্তী বিশ্লেষণগুলো নিশ্চিত করে খনিজটি আসলে অ্যান্ড্রাডাইট। প্রায় ০.৮ বাই ০.৫ মিলিমিটার আকারের একটি ছোট শিলাখণ্ডে মাত্র কয়েকটি কণা পাওয়া গেছে। এই আকার একটি পোস্তদানার চেয়েও ছোট।
এনডব্লিউএ ৮১৭১ নামের এই উল্কাপিণ্ডটি নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহ অনেক আগে থেকেই। এটি মূলত একধরনের ব্যাসাল্টিক ব্রেসিয়া শিলা। শিলাটির গঠন কিছুটা ফ্রুটকেকের মতো। ব্যাসাল্ট অংশটি কেকের মূল মণ্ড হিসেবে কাজ করে। অন্যান্য খনিজগুলো ড্রাই ফ্রুটস বা বাদামের মতো এর সঙ্গে মিশে থাকে। ব্যাসাল্ট এবং এর ভেতরের খনিজগুলোর কারণে এনডব্লিউএ ৮১৭১ মঙ্গলের ভূতত্ত্ব সম্পর্কে অনেক তথ্য জানাতে পারে।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, উল্কাপিন্ডে থাকা গার্নেট ম্যাগমা থেকে তৈরি হতে পারে। অথবা এটি কোনো রূপান্তরিত রূপ হতে পারে। এ বিষয়ে তানিয়া কিজোভস্কি বলেন, পৃথিবীতে রূপান্তরিত শিলায় গার্নেট পাওয়ার ঘটনা খুব সাধারণ। রূপান্তর প্রক্রিয়াটি তীব্র তাপ, উচ্চ চাপ বা গরম তরলের সংস্পর্শে আগ্নেয় বা পাললিক শিলাকে নতুন রূপ দেয়। মঙ্গলে এই রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় তাপ ও চাপ তৈরি হতে পারে উল্কাপিণ্ডের আঘাতের ফলে। মঙ্গলের ভূত্বকের ভেতরে ম্যাগমা ওঠার ফলেও এটি হতে পারে।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব পোর্টসমাউথের গ্রহবিজ্ঞানী জেমস ডার্লিং বলেন, এই অনুসন্ধান মঙ্গল গ্রহের ভূতত্ত্ব সম্পর্কে আমাদের ধারণায় একটি সম্পূর্ণ নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এটি আমাদের প্রতিবেশী গ্রহের বিবর্তন বোঝার জন্য একটি চমৎকার নতুন জানালা খুলে দিয়েছে। বিজ্ঞান সাময়িকী জিওকেমিকেল পারসপেক্টিভস লেটার্সে এই গবেষণার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট