১০০ বছর পর শ্রোডিঞ্জারের বর্ণতত্ত্বের প্রমাণ
সৌন্দর্য হয়তো দর্শকের চোখে থাকে, কিন্তু রং বা বর্ণ মোটেও তেমন নয়। যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যালামস ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির এক নতুন গবেষণায় দাবি করা হয়েছে যে রঙের বৈশিষ্ট্যগুলো আমাদের মস্তিষ্কের সহজাত উপলব্ধির অংশ। ২০১৫ সালে ইন্টারনেটে একটি পোশাকের রং নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, সেটি বা বিভিন্ন সংস্কৃতিতে রঙের ভিন্ন ভিন্ন নামকরণের কথা আমরা জানি। তবে নতুন এই গবেষণা বলছে, আমাদের রঙের মৌলিক পার্থক্য বোঝার ক্ষমতা সংস্কৃতি বা অর্জিত অভিজ্ঞতার মতো বাইরের কোনো উপাদানের ওপর নির্ভর করে না। এটি আমাদের দৃষ্টিশক্তির এক সহজাত জ্যামিতিক বৈশিষ্ট্য।
এই গবেষণাটি মূলত বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী আরউইন শ্রোডিঞ্জারের কাজের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। কোয়ান্টাম মেকানিকসের শ্রোডিঞ্জারের বিড়াল পরীক্ষার জন্য তিনি জগদ্বিখ্যাত হলেও, জীববিজ্ঞান ও রঙের উপলব্ধির ওপরও তার গভীর গবেষণা ছিল।
নতুন এই গবেষণার লেখকেরা রঙের উপলব্ধিকে একটি জ্যামিতিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে এসেছেন। তাঁরা দেখতে পেয়েছেন যে রঙের হিউ, স্যাচুরেশন এবং ব্রাইটনেস বা লাইটনেস নিয়ে শ্রোডিঞ্জারের গাণিতিক সংজ্ঞায় কিছু ত্রুটি ছিল। ১০০ বছরের বেশি সময় পর গবেষকেরা সেই অস্পষ্টতা দূর করে শ্রোডিঞ্জারের কাজটিকে পূর্ণতা দিয়েছেন।
গবেষণার প্রধান লেখক এবং ডেটা সায়েন্টিস্ট রোকসানা বুজাক বলেন, ‘আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি রঙের এই গুণাবলি বাইরের কোনো সাংস্কৃতিক বা শেখা অভিজ্ঞতা থেকে আসে না, বরং এটি রঙের নিজস্ব পরিমাপের বা মেট্রিকের সহজাত বৈশিষ্ট্য। মানুষের দৃষ্টিশক্তি মূলত তিনটি রং-সংবেদনশীল কোনো কোষের ওপর নির্ভরশীল। প্রতিটি কোষ ভিন্ন ভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো গ্রহণ করে। এই কোষের সংকেতের সংমিশ্রণেই আমরা রঙের বর্ণালি দেখি। এই প্রক্রিয়াটি আমাদের মস্তিষ্কে রঙের এক ত্রিমাত্রিক জ্যামিতিক জগৎ বা কালার স্পেস তৈরি করে।
উনিশ শতকে গণিতবিদ বার্নহার্ড রিম্যান ধারণা দিয়েছিলেন, আমাদের রঙের এই মানসিক জগৎটি সোজা নয়, বরং বাঁকানো। ১৮৭০ দশকে হারমান ফন হেলমহোল্টজ পরামর্শ দিয়েছিলেন, রঙের বৈশিষ্ট্যকে জ্যামিতিকভাবে সংজ্ঞায়িত করা সম্ভব। ১৯২০ দশকে শ্রোডিঞ্জার এই রিম্যানিয়ান মডেল ব্যবহার করে রঙের বৈশিষ্ট্যগুলো নির্ধারণ করেছিলেন। কিন্তু তিনি নিউট্রাল অ্যাক্সিস বা সাদা-কালো ধূসর রেখাটিকে গাণিতিকভাবে স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করেননি।
লস আলামসের গবেষকেরা লক্ষ করেন, ল্যাবে পরীক্ষার সময় রঙের কিছু বিশেষ প্রভাব যেমন বেজোল্ড-ব্রুকে ইফেক্ট শ্রোডিঞ্জারের তত্ত্বে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছিল না। এই প্রভাবে আলোর তীব্রতা বাড়লে রঙের হিউ বা আভা পরিবর্তিত মনে হয়। গবেষকেরা শ্রোডিঞ্জারের সোজা রেখার সংজ্ঞার পরিবর্তে জিওডেসিক পাথ বা বাঁকানো পথে ক্ষুদ্রতম দূরত্বের গাণিতিক সূত্র ব্যবহার করেছেন। এর ফলে রঙের উপলব্ধি এবং গাণিতিক হিসাবের মধ্যে যে গরমিল ছিল তা দূর হয়েছে। তাঁরা দেখিয়েছেন, রঙের পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে মানুষের মস্তিষ্ক একটি নন-রিম্যানিয়ান জ্যামিতি অনুসরণ করে।
এই গবেষণার মাধ্যমে হেলমহোল্টজের সেই দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। নতুনভাবে রঙের হিউ, স্যাচুরেশন এবং লাইটনেসকে সম্পূর্ণ জ্যামিতিকভাবে সংজ্ঞায়িত করা সম্ভব হলো, যেখানে বাইরের কোনো অভিজ্ঞতার সাহায্য প্রয়োজন নেই। গবেষণাটি কম্পিউটার গ্রাফিকস ফোরাম সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।
সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট