ইউরেনিয়ামের মহাজাগতিক উৎস কোথায়

ইউরেনিয়ামের কনটেইনারফাইল ছবি: রয়টার্স

গত মঙ্গলবার পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লিতে পারমাণবিক জ্বালানি বা ইউরেনিয়ামের ব্যবহার শুরু হয়েছে। বিশ্বজুড়ে উৎপাদিত মোট বিদ্যুতের প্রায় ৯ শতাংশ আসে ইউরেনিয়াম থেকে। তবে পৃথিবীর বিবর্তনে এই মৌলের যে ভূমিকা, তার কাছে এই পরিসংখ্যান নেহাতই নগণ্য। ইউরেনিয়াম কেবল একটি জ্বালানি নয়, আমাদের গ্রহের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসের এক প্রধান কারিগর বলে বিবেচনা করা হয়। অনেক বিজ্ঞানীর মতে, প্রায় ৬০০ কোটি বছর আগে মহাকাশের কোনো এক সুপারনোভা বা নক্ষত্রের প্রচণ্ড বিস্ফোরণের মাধ্যমে ইউরেনিয়ামের সৃষ্টি হয়েছিল। তবে কিছু গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে, দুটি নিউট্রন নক্ষত্রের সংঘর্ষের ফলেও এই ভারী মৌলটির সৃষ্টি হতে পারে।

মহাজাগতিক রসায়নবিদদের মতে, ইউরেনিয়াম তৈরির জন্য প্রয়োজন প্রচুর পরিমাণে নিউট্রন কণা। যখন কোনো বিশাল নক্ষত্রের জীবনকাল শেষ হয় এবং এর কেন্দ্র ভয়াবহভাবে ধসে পড়ে, তখন সেখানে প্রচণ্ড নিউট্রন ফ্লাক্স তৈরি হয়। এই নিউট্রন দ্রুত অন্য নিউক্লিয়াসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ইউরেনিয়ামের মতো ভারী মৌল তৈরি করে। দ্বিতীয় আরেকটি রোমাঞ্চকর তত্ত্ব রয়েছে। নিউট্রন নক্ষত্র অত্যন্ত ঘন। এর মাত্র এক চা-চামচ উপাদানের ওজন প্রায় ৫০০ কোটি টন। যখন দুটি নিউট্রন নক্ষত্র একে অপরের খুব কাছে আসে এবং প্রবল মহাকর্ষীয় টানে সজোরে ধাক্কা খায়, তখন সেখানে সোনা, প্লাটিনাম এবং ইউরেনিয়ামের মতো ভারী ধাতু প্রচুর পরিমাণে উৎপন্ন হয়।

পৃথিবীর বয়স প্রায় ৪৫৫ কোটি বছর। এই তথ্য আমরা জানতে পেরেছি ইউরেনিয়াম থেকে সিসায় রূপান্তরের তেজস্ক্রিয় ঘড়ির মাধ্যমে। বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখেছেন, যদি সৌরজগতের সব ইউরেনিয়াম একটিমাত্র সুপারনোভা থেকে আসত, তবে সেই ঘটনা ঘটত প্রায় ৬৫০ কোটি বছর আগে। তবে বাস্তবে এটি কোনো একক ঘটনা ছিল না; প্রায় ৬০০ কোটি থেকে ২০ কোটি বছর আগপর্যন্ত একাধিক নক্ষত্রের বিস্ফোরণ থেকে আসা উপাদান দিয়ে আমাদের পৃথিবী ও সৌরজগৎ গঠিত হয়েছে।

আমাদের পায়ের নিচের পৃথিবী এখনো উত্তপ্ত। এর প্রধান কারণ ইউরেনিয়াম। পৃথিবীর অভ্যন্তরে যে তাপ প্রবাহিত হয়, তার প্রায় অর্ধেক আসে ইউরেনিয়াম, থোরিয়াম এবং পটাশিয়ামের তেজস্ক্রিয় ক্ষয় থেকে। এই তাপই পৃথিবীর ম্যান্টলে পরিচলন স্রোত তৈরি করে, যা টেকটোনিক প্লেটকে সচল রাখে। আজ আমরা যে পাহাড়-পর্বত বা মহাদেশের সরণ দেখি, তার নেপথ্য শক্তি জোগাচ্ছে এই ইউরেনিয়াম।

আজ থেকে প্রায় ২৫০ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে যখন সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় অক্সিজেনের পরিমাণ বাড়তে শুরু করে, তখন ইউরেনিয়ামের আচরণেও পরিবর্তন আসে। অক্সিজেনের উপস্থিতিতে ইউরেনিয়াম দ্রবণীয় হয়ে পড়ে এবং পানির মাধ্যমে পরিবাহিত হতে শুরু করে। ফলে ইউরেনিয়াম ভূ-ত্বকের বিভিন্ন স্থানে জমা হয়ে খনি তৈরি করে।

সূত্র: ওয়ার্ল্ড নিউক্লিয়ার