এলিয়েন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এত কৌতূহল কেন
যুক্তরাষ্ট্র এখন আবার চাঁদে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক তখনই মহাকাশে ভিনগ্রহী বা ইউএফও নিয়ে জনমনে কৌতূহল নতুন করে দানা বাঁধছে। একটি চিরচেনা প্রশ্ন আবার সামনে এসেছে। যদি মহাবিশ্বে উন্নত কোনো সভ্যতা থেকে থাকে, তবে তারা মানবজাতিকে কীভাবে দেখবে—এ নিয়ে মার্কিনদের চিন্তার শেষ নেই। গত ফেব্রুয়ারি মাসে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার একটি মন্তব্য এই বিতর্ককে উসকে দেয়। তিনি বলেন, ভিনগ্রহীরা বাস্তব, যদিও তিনি তাদের দেখেননি এবং তারা ‘এরিয়া ৫১’ নামের এলাকায় বন্দী নেই। বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও জনগণের ব্যাপক আগ্রহের কথা বিবেচনা করে এ–সংক্রান্ত সরকারি ফাইল প্রকাশের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। নাসার আর্টেমিস–২ মিশনের সময় এ আলোচনা নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
ভিনগ্রহী প্রাণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের বিশ্বাসের ভিত্তি বেশ মজবুত। ২০২১ সালের এক জরিপ অনুযায়ী, দুই-তৃতীয়াংশ আমেরিকান বিশ্বাস করেন, অন্য গ্রহে বুদ্ধিমান প্রাণ রয়েছে। প্রায় অর্ধেক প্রাপ্তবয়স্ক মনে করেন, সামরিক বাহিনীর দেখা ইউএফও ভিনগ্রহী প্রাণের প্রমাণ। ক্যালিফোর্নিয়ার এসইটিআইটি ইনস্টিটিউটের প্রধান বিল ডায়মন্ডের মতে, ‘এটি মানুষের একটি সহজাত প্রবৃত্তি। আমরা এই বিশাল মহাবিশ্বে নিজেকে একা ভাবতে চাই না।’
হার্ভার্ডের তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী অ্যাভি লোয়েব এ বিষয়ে বেশ হতাশাজনক মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি যদি দূর থেকে পৃথিবী দেখতাম, তবে আমি বেশ হতাশ হতাম। আমাদের বিনিয়োগের অধিকাংশ ব্যয় হয় যুদ্ধবিগ্রহে এবং একে অপরকে মেরে ফেলার হাত থেকে বাঁচতে। ইউক্রেন যুদ্ধের মতো বিষয় বুদ্ধিমত্তার পরিচয় নয়। ভিনগ্রহীরা হয়তো আমাদের দেখে হাসছে বা আমাদের ওপর নজর রাখছে, যাতে আমরা তাদের জন্য বিপজ্জনক বা শিকারি হয়ে না উঠি। ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানের জ্যোতির্বিজ্ঞান অধ্যাপক এডউইন বারগিনও মনে করেন, ‘উন্নত কোনো সভ্যতা আমাদের কর্মকাণ্ডকে পাগলামি হিসেবে দেখবে।’
যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৪৭ সালে নিউ মেক্সিকোর রসওয়েলে ধ্বংসাবশেষ উদ্ধারের পর থেকেই ভিনগ্রহীদের নিয়ে আমেরিকার উন্মাদনা শুরু হয়। সামরিক বাহিনী প্রথমে একে উড়ন্ত চাকতি বললেও পরে আবহাওয়া বেলুন বলে দাবি বদল করে। এতে শুরু হয় ষড়যন্ত্র তত্ত্ব। হলিউডের অনেক সিনেমা এলিয়েনদের একটি নির্দিষ্ট আকার যেমন ধূসর বর্ণের মানবাকৃতি বা সবুজ খুদে মানুষের মতো ছবি সবার মনের মধ্যে গেঁথে দিয়েছে। ডিউক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক প্রিসিলা ওয়াল্ডের মতে, ‘সিনেমায় এলিয়েনদের আক্রমণাত্মক দেখানো আসলে আমাদের নিজেদের স্বভাবেরই প্রতিফলন।’
বর্তমানে ‘ইউএফও’ শব্দটির পরিবর্তে ইউএপি বা আনআইডেন্টিফায়েড অ্যানোমলাস ফেনোমেনা শব্দবন্ধটি বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০২৪ সালে পেন্টাগন শত শত ইউএপি রিপোর্ট পর্যালোচনা করলেও তা সরাসরি ভিনগ্রহীদের কাজ বলে প্রমাণ পায়নি। তবে বিল ডায়মন্ড বলেন, এর মানে এই নয় যে এসব বস্তু কাল্পনিক। মানুষ আকাশে এমন অনেক কিছু দেখে, যা কোনো ড্রোন, বিমান বা পাখি নয়, তাই ইউএপি।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবসরপ্রাপ্ত রিয়ার অ্যাডমিরাল টিমোথি গ্যালাউডেট জোরালো দাবি করেন, সরকার অনেক কিছু গোপন করছে। তাঁর মতে, অমানবিক বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রিত যান পুরোপুরি বাস্তব। তিনি ৩২ বছরের চাকরিজীবনে অনেক গোপন ভিডিও দেখেছেন এবং দাবি করেছেন নৌবাহিনীর কাছে ইউএপির প্রচুর ভিডিও সংরক্ষিত আছে। তিনি মনে করেন, সত্য লুকিয়ে রাখা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে। বিল ডায়মন্ড বলেন, ‘অনেক সময় সংবেদনশীল সামরিক প্রযুক্তি আকাশে এমন কিছু শনাক্ত করে, যা গোপনীয় রাখতে হয়। যদি কোনো উন্নত সভ্যতা মহাকাশ ভ্রমণের প্রযুক্তি অর্জন করে থাকে, তবে তারা চাইলে আমাদের সাথে যোগাযোগ করবেই। তাদের ধরা পড়া বা না পড়া সম্পূর্ণ তাদের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে।’
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া