ঠান্ডায় পানি যেভাবে রূপ নেয় রহস্যময় কাচে
পৃথিবীর উপরিভাগের ৭০ শতাংশজুড়ে পানির অবস্থান। আবার মানবদেহের ৬০ শতাংশে রয়েছে পানি। সাধারণ তাপমাত্রায় তরল থাকলেও ঠান্ডায় ক্রিস্টাল বা বরফে পরিণত হয় পানি। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে পানি বরফ না হয়ে এক অদ্ভুত গ্লাস বা কাচের মতো নিরাকার কঠিন পদার্থে রূপ নিতে পারে। সম্প্রতি সুইজারল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার একদল বিজ্ঞানী এই রহস্যময় রূপান্তর সরাসরি পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন।
প্রকৃতিতে জলীয় বাষ্পের এমন রূপ সাধারণত মেরু অঞ্চলের স্ট্রাটোস্ফিয়ারিক মেঘে দেখা যায়। চরম ঠান্ডায় বেঁচে থাকা কিছু জীব কোষকে বরফ ক্রিস্টালের হাত থেকে রক্ষা করতে এই পদ্ধতি ব্যবহার করে। তবে তরল থেকে পানির কাচে রূপ নেওয়ার বিষয়টি এত দিন বিজ্ঞানীদের চোখের আড়ালেই ছিল। পানি যখন জমে, তখন এর অণুগুলো একটি সুবিন্যস্ত কাঠামোর বরফ ক্রিস্টাল তৈরি করে। মাইনাস ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে এই পরিবর্তন ঘটে। এর নিচে যে তাপমাত্রার জগৎ রয়েছে, তাকে নো ম্যানস ল্যান্ড বলে অভিহিত করেন বিজ্ঞানীরা। এত দিন ধারণা ছিল, মাইনাস ১৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি তাপমাত্রায় পানির গ্লাস ট্রানজিশন ঘটে। কিন্তু ক্রিস্টাল বরফ তৈরি হওয়ার কারণে বিজ্ঞানীরা এত দিন এই প্রক্রিয়া সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারেননি।
গবেষণার জন্য ফাইয়ানট্রিয়ল নামের একধরনের স্বচ্ছ ফ্যাটি অ্যালকোহল অণু দিয়ে তৈরি লিপিড স্তরের মাঝখানে পানি আটকে দেন বিজ্ঞানীরা। এই স্তরের ভেতরে পানি অণুর পরিমাণ ছিল মাত্র কয়েক অণু পুরু বা এক বিলিয়ন মিটারের কম। এই বিশেষ ব্যবস্থায় তাপমাত্রা কমার পরও পানি বরফ বা ক্রিস্টালে পরিণত হতে পারেনি। এর ফলে বিজ্ঞানীরা এর লিকুইড–টু–গ্লাস রূপান্তর সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পান। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ান নিউক্লিয়ার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি অর্গানাইজেশনের বিজ্ঞানীরা এক্স–রে স্ক্যাটারিং ও নিউট্রন স্পেকট্রোমিটার ব্যবহার করেন। এর মাধ্যমে পানির অণুর গতিবিধি ও হাইড্রোজেন পরমাণুর নড়াচড়া শনাক্ত করেন তাঁরা। দেখা গেছে, মাইনাস ৬৩ থেকে মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে কনফাইন্ড ওয়াটারের গতি শ্লথ হয়ে আসে। অণুগুলোর গতি কমে গিয়ে মাইনাস ৭৪ থেকে মাইনাস ৬৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে এটি একটি বিশৃঙ্খল কাচের মতো কঠিন অবস্থায় পৌঁছে যায়।
তাপমাত্রা আরও কমলে এই উপাদান ভঙ্গুর হয়ে যায় এবং এতে ফাটল ধরতে শুরু করে। পানির এই অদ্ভুত আচরণ কেবল তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান নয়; বরং ব্যবহারিক ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা রাখবে। জীববিজ্ঞানের উপাদান ক্রায়োপ্রিজারভেশন ও খাবার দীর্ঘ সময় ডিপ ফ্রিজে সংরক্ষণের ক্ষেত্রে এই গবেষণা কাজে লাগবে। ভবিষ্যতে টিস্যু সংরক্ষণ বা আইসক্রিম তৈরির প্রযুক্তিতেও এর সুফল পাওয়া যেতে পারে।
সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট