একই গ্যালাক্সিতে তিনটি ব্ল্যাকহোলের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা
মহাবিশ্বের অসীম শূন্যতায় লুকিয়ে আছে কোটি কোটি নক্ষত্রপুঞ্জ আর রহস্যময় ব্ল্যাকহোল (কৃষ্ণগহ্বর)। সৃষ্টির আদিম ইতিহাস জানতে বিজ্ঞানীরা প্রতিনিয়ত শক্তিশালী টেলিস্কোপের মাধ্যমে মহাকাশের গভীরে অনুসন্ধান চালাচ্ছেন। এবার মহাবিশ্বের গভীরে থাকা একটি গ্যালাক্সিতে একসঙ্গে তিনটি সক্রিয় সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলের সন্ধান পেয়েছেন জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর এক্সট্রাটেরেস্ট্রিয়াল ফিজিকসের বিজ্ঞানীরা। মহাজাগতিক এই গ্যালাক্সির নাম দেওয়া হয়েছে ‘জে০১৪৮-৪২১৪’। সেখানে থাকা তিনটি ব্ল্যাকহোলই চারপাশের অ্যাক্রিশন ডিস্ক থেকে বস্তু নিজেদের দিকে সক্রিয়ভাবে টেনে নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন তাঁরা।
বিজ্ঞানীদের তথ্যমতে, পৃথিবী থেকে প্রায় ১ হাজার ২৫০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত গ্যালাক্সিটি ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে। গ্যালাক্সিটির কেন্দ্রীয় অঞ্চলে দুটি ব্ল্যাকহোল খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে। এদের পারস্পরিক দূরত্ব প্রায় ৬২০ আলোকবর্ষ। তৃতীয় ব্ল্যাকহোলটি গ্যালাক্সির বহিরাঞ্চলে অবস্থান করছে। কেন্দ্র থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৫ হাজার ৫০০ আলোকবর্ষ। গবেষণায় তিনটি ব্ল্যাক হোলের ভর সুনির্দিষ্টভাবে পরিমাপ করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় ব্ল্যাকহোলটির ভর সূর্যের চেয়ে প্রায় ৮ কোটি গুণ বেশি। অন্য দুটি ব্ল্যাকহোলের ভর যথাক্রমে সূর্যের ৬ লাখ ও ২০ লাখ গুণ বেশি।
ব্ল্যাকহোলে শক্তিশালী মহাকর্ষীয় টানে হাইড্রোজেন পরমাণু অত্যন্ত উচ্চবেগে ঘুরতে থাকে। আয়োনাইজড হাইড্রোজেনের এই গতি বর্ণালিতে বিশেষ সংকেত রেখে যায়। সেই বিচ্ছুরিত আলো বিশ্লেষণ করে ব্ল্যাকহোলগুলো শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। গ্যালাক্সির কেন্দ্রীয় অঞ্চলে দুটি ব্ল্যাকহোল কাছাকাছি থাকায় বর্ণালি বেশ জটিল রূপ নেওয়ায় দুটি আলাদা উৎস পৃথক করার জন্য বিজ্ঞানীরা স্পেকট্রো-অ্যাস্ট্রোমেট্রি পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। এই পদ্ধতিতে গ্যালাক্সিজুড়ে নির্গত আলোর সূক্ষ্ম স্থানিক পরিবর্তন মাপার মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট অবস্থান চিহ্নিত করা যায়। জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের এনআইআরস্পেক-আইএফএস যন্ত্র এ ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করেছে।
মহাজাগতিক বিবর্তনের তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক মহাবিশ্বে গ্যালাক্সিগুলো কাছাকাছি এসে একীভূত হতো। গ্যালাক্সিগুলো একীভূত হওয়ার ফলে কেন্দ্রে থাকা ব্ল্যাকহোলগুলোও একত্র হয়ে আকারে বড় হতো। নতুন আবিষ্কৃত গ্যালাক্সির কেন্দ্রে থাকা দুটি ব্ল্যাকহোল কয়েক শ কোটি বছরের মধ্যে একীভূত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিজ্ঞানী হান্না ইউবলার জানিয়েছেন, ‘দূরবর্তী মহাবিশ্বের একটিমাত্র গ্যালাক্সিতে তিনটি সক্রিয় ব্ল্যাকহোলের সন্ধান পাওয়ার ঘটনা এবারই প্রথম। ভবিষ্যতে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের মাধ্যমে ব্ল্যাকহোল একীভূত হওয়ার যে ঘটনা আমরা দেখার আশা করছি, এই আবিষ্কার তারই পথ সুগম করেছে।’
বিজ্ঞানী জোভান্নি মাজোলারি জানিয়েছেন, ‘জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের উপাত্ত আমাদের কেবল তিনটি ব্ল্যাকহোল শনাক্ত করতেই সাহায্য করেনি—এদের ভর, পদার্থ গ্রহণের হার ও গ্যালাক্সির তারকা ভর পরিমাপের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।’
সূত্র: ফিজিস ডটঅর্গ