পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র উল্টে যাওয়ার পর কী ঘটেছিল
আমরা জানি পৃথিবীর উপরিভাগ থেকে প্রায় ১ হাজার ৮০০ মাইল গভীরে তরল বহিঃকেন্দ্রে গলিত ধাতুর অবিরাম ঘূর্ণন থেকে বিদ্যুৎপ্রবাহ তৈরি হয়। এই বিদ্যুৎপ্রবাহ জিওডায়নামো প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি করে, যা আমাদের গ্রহকে মহাজাগতিক বিকিরণ থেকে রক্ষা করে। ফলে চৌম্বকক্ষেত্র পরিবর্তন বা উল্টে গেলে জীবজগতের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়। প্রায় একচল্লিশ হাজার বছর আগে পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র উল্টে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। সে সময় পৃথিবীর মহাজাগতিক বিকিরণ ঢাল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।
বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন গবেষণার মাধ্যমে অতীতে পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র উল্টে যাওয়ার ঘটনাকে শব্দে রূপ দিয়েছেন। ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সির সোয়ার্ম স্যাটেলাইট মিশনের তথ্য ব্যবহার করে এসব শব্দ তৈরি করা হয়েছে। প্রাচীন শিলা ও পলিমাটিতে সংরক্ষিত চৌম্বকক্ষেত্রের গতিবিধি বিশ্লেষণ করে তৈরি এসব শব্দের মধ্যে কাঠের মড়মড় শব্দ এবং পাথরের সংঘর্ষের আওয়াজ ব্যবহার করা হয়েছে।
নতুন তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, উল্টে যাওয়ার পর পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রের শক্তির মাত্রা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় মাত্র পাঁচ শতাংশে নেমে এসেছিল। এই দুর্বল অবস্থা কয়েক শতাব্দী স্থায়ী হয়েছিল। বরফের স্তর ও সামুদ্রিক পলি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বেরিলিয়াম-১০ আইসোটোপের মাত্রা দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় পৃথিবীতে অতিরিক্ত মাত্রায় বিকিরণ প্রবেশ করে ওজোনস্তর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, অস্ট্রেলিয়ার মেগাফনা বা বিশাল আকৃতির প্রাণীদের রহস্যময় বিলুপ্তির সঙ্গে এই ঘটনার যোগসূত্র রয়েছে। শুধু তাই নয়, পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র উল্টে যাওয়ার পর চরম পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে মানুষ গুহার ভেতরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল। এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে সময় লেগেছিল প্রায় ২৫০ বছর।
বর্তমানে পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রে কিছু অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। উত্তর চৌম্বক মেরু দ্রুতগতিতে সরে যাচ্ছে সাইবেরিয়ার দিকে। এ ছাড়া দক্ষিণ আটলান্টিক অ্যানিম্যালিতে চৌম্বকক্ষেত্রে একটি বিশাল ফাটল বা গর্ত তৈরি হয়েছে। জার্মানির জিএফজে পটসডামের বিজ্ঞানী সানজা পানোভস্কা জানিয়েছেন, পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র দুর্বল হয়ে পড়ার এই ভয়ংকর রূপ মানুষের মনে নতুন ভাবনার জন্ম দিয়েছে।
সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট