সুস্থ জীবনের জন্য পানির কোনো বিকল্প নেই। তবে সেই পানিই যদি নীরবে বয়ে আনে উচ্চ রক্তচাপ, তবে সংকট দাঁড়িয়ে যায় জনস্বাস্থ্যের একদম কেন্দ্রে। ফ্লোরিডা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির জনস্বাস্থ্য গবেষক অধ্যাপক রাজীব চৌধুরী এবং তাঁর আন্তর্জাতিক গবেষণা দলের সাম্প্রতিক এক বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এমন এক উদ্বেগজনক চিত্র। গবেষণায় দেখা গেছে, খাওয়ার পানিতে উচ্চমাত্রার লবণাক্ততা মানুষের রক্তচাপ বাড়িয়ে দিয়ে হৃদ্রোগ ও হাইপারটেনশনের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি ভূগর্ভস্থ সুপেয় পানিতে মিশে যাওয়ায় সংকটটি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।
প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপকালে অধ্যাপক রাজীব চৌধুরী তাঁর বিশদ বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ অঞ্চলের তুলনায় উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে লবণাক্ততার কারণে রক্তচাপ বৃদ্ধির প্রভাব অত্যন্ত স্পষ্ট। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রের পানি ভূগর্ভে ঢুকে সুপেয় পানির উৎস ধ্বংস করছে। ফলে আগামী দুই দশকে উপকূলীয় এলাকায় নিয়ন্ত্রণহীন উচ্চ রক্তচাপ এবং আনুষঙ্গিক হৃদ্রোগের ঝুঁকি আরও ব্যাপক ও ভয়াল রূপ নিতে পারে।
গবেষণা দলে যুক্ত আছেন আরেকজন বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ডা. রজত দাশগুপ্ত। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসির ভ্যান্ডারবিল্ট ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টারে কর্মরত, রোগতত্ত্ববিদ হিসেবে কাজ করছেন। তিনি বলেন, বর্তমানে উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধে কেবল খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান বা শারীরিক পরিশ্রমের মতো আচরণগত ঝুঁকিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উচিত পানির সোডিয়ামের জন্য সুনির্দিষ্ট স্বাস্থ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও নির্দেশিকা নির্ধারণ করা। পরিচ্ছন মনিটরিং ও ফিল্টারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে পানীয় জলের পরিবেশগত ঝুঁকিগুলোকেও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা এখন সময়ের দাবি।
তাঁদের গবেষণায় দেখা যায়, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩০০ কোটির বেশি মানুষ উপকূলীয় বা তার কাছাকাছি অঞ্চলে বসবাস করেন, যাঁদের সিংহভাগই স্বল্প ও মধ্যম আয়ের দেশের বাসিন্দা। এসব উপকূলীয় এলাকায় মাটির নিচের ভূগর্ভস্থ পানিই পানীয় ও রান্নাবান্নার প্রধান উৎস। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানিতে লোনাপানির অনুপ্রবেশ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। অনেক সময় খাওয়ার পানিতে নোনতা স্বাদ টের না পাওয়া গেলেও মানুষ অজান্তেই প্রতিদিন ক্ষতিকর সোডিয়াম গ্রহণ করছে।
প্রভাবের ভয়াবহতা বুঝতে অধ্যাপক রাজীব চৌধুরীর দলটি যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ইসরায়েল, বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, কেনিয়া ও ইউরোপের কয়েকটি দেশের ৭৪ হাজারের বেশি মানুষের ওপর করা ২৭টি গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে। ফলাফলে দেখা যায়, যাঁরা লবণাক্ত পানি পান করছেন, তাঁদের সিস্টোলিক রক্তচাপ গড়ে ৩.২২ মিলিমিটার-এইচজি এবং ডায়াস্টোলিক রক্তচাপ গড়ে ২.৮২ মিলিমিটার-এইচজির বেশি। ফলে সামগ্রিকভাবে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ে প্রায় ২৬ শতাংশ।
অধ্যাপক রাজীব চৌধুরী আরও বলেন, ‘খাওয়ার পানির লবণাক্ততার সঙ্গে সরাসরি করোনারি হৃদ্রোগ কিংবা স্ট্রোকের মতো দীর্ঘমেয়াদি কার্ডিওভাসকুলার রোগের সম্পর্ক নিয়ে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক গবেষণার ঘাটতি রয়েছে। ভবিষ্যতে আমরা দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকার মতো অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি প্রস্পেক্টিভ কোহর্ট স্টাডি পরিচালনা করতে চাই, যাতে বোঝা যায় লোনাপানি হ্রাসের অভিযোজন কৌশল হৃদ্রোগের সার্বিক ঝুঁকি কতটা কমাতে পারে।’
বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য, অসংক্রামক রোগনিয়ন্ত্রণ এবং বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্য অসমতা দূরীকরণে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কাজ করছেন চিকিৎসক ও বিজ্ঞানী রাজীব চৌধুরী। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির রবার্ট স্টেম্পেল কলেজ অব পাবলিক হেলথ অ্যান্ড সোশ্যাল ওয়ার্কের ডিপার্টমেন্ট অব গ্লোবাল হেলথের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ফ্লোরিডা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে যোগদানের আগে তিনি যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে সহযোগী অধ্যাপক এবং এক্সিটার বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্লোবাল হেলথের অধ্যাপক হিসেবে কাজ করেছেন।
চিকিৎসক-বিজ্ঞানী রজত দাস গুপ্ত একজন মহামারি ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। তিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসির ন্যাশভিলে অবস্থিত ভ্যান্ডারবিল্ট ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টারের এপিডেমিওলজি বিভাগে টি৩২ অর্থায়নে পোস্টডক্টরাল রিসার্চ ফেলো হিসেবে কর্মরত। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্নাতক, ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ থেকে জনস্বাস্থ্যে স্নাতকোত্তর এবং সাউথ ক্যারোলাইনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এপিডেমিওলজিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর গবেষণার মূল বিষয় দক্ষিণ এশিয়া ও সাব-সাহারান আফ্রিকা অঞ্চলের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য জরিপ ও কোহর্ট স্টাডির ওপর ভিত্তি করে ক্যানসার ঝুঁকির জীবনযাপন পদ্ধতি, মেটাবলিক এবং আর্থসামাজিক নিয়ামকগুলো বিশ্লেষণ করা।
সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট