রোগীর আস্থা: বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার নতুন চ্যালেঞ্জ

বাগেরহাটের রামপালে আমাদের গ্রাম ক্যানসার কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের ভবনছবি: আমাদের গ্রাম

গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। টিকাদান থেকে মাতৃস্বাস্থ্য, কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে বিশেষায়িত হাসপাতাল—সীমিত সম্পদ নিয়েও সুপরিকল্পিত নীতি ও স্থানীয় উদ্ভাবনের মাধ্যমে বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রে সফলতা দেখিয়েছে। তবু একটি বাস্তবতা এখনো জাতীয়ভাবে গভীর মনোযোগ দাবি করে: অনেক বাংলাদেশি রোগী এখনো পরামর্শ, রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান।

সাম্প্রতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে এই প্রবণতার গুরুত্ব উঠে এসেছে। দ্য ডেইলি স্টারের একটি সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, অনেক রোগী দেশের বাইরে চিকিৎসা নিতে যান কারণ স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবায় অবকাঠামো, যন্ত্রপাতি, দক্ষ জনবল, ব্যয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে আস্থার ঘাটতি রয়েছে। একই সঙ্গে রোগীর অভিজ্ঞতা, চিকিৎসক-রোগী যোগাযোগ এবং সেবার মান উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে বাংলাদেশি চিকিৎসা-ভ্রমণকারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে; ২০২২ সালে যেখানে ৩ লাখ ৪ হাজার ৬৭ জন বাংলাদেশি চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ভারতে গিয়েছিলেন, ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ লাখ ৪৯ হাজার ৫৭০ জনে।

এটি রোগীদের দোষারোপ করার বিষয় নয়। ক্যানসার, হৃদ্‌রোগ, কিডনির রোগ, বন্ধ্যত্ব বা জটিল উপসর্গ নিয়ে মানুষ যখন উদ্বিগ্ন হন, তখন তাঁরা স্বাভাবিকভাবেই এমন একটি সেবা খোঁজেন, যেখানে তাঁরা আত্মবিশ্বাস ও নিশ্চয়তা পান। রোগীরা শুধু বড় ভবন বা আধুনিক যন্ত্রপাতির জন্য বিদেশে যান না। তাঁরা যান সময় পাওয়ার জন্য, ব্যাখ্যা পাওয়ার জন্য, সমন্বিত সেবা পাওয়ার জন্য, দ্বিতীয় মতামত পাওয়ার জন্য এবং এই অনুভূতির জন্য যে কেউ তাঁদের পুরো মানুষ হিসেবে দেখছেন—শুধু পরীক্ষার রিপোর্ট হিসেবে নয়।

বাংলাদেশে ভালো চিকিৎসক, দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী এবং সক্ষম প্রতিষ্ঠান আছে। সমস্যা অনেক সময় দক্ষতার অভাব নয়; সমস্যা হলো রোগীকেন্দ্রিক ব্যবস্থাপনার অভাব। অনেক রোগী মনে করেন, স্থানীয় পরামর্শের সময় খুব কম। অনেক সময় পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা ছাড়াই তাঁদের এক পরীক্ষাগার থেকে অন্য পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়। এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসা-পরামর্শ সঠিক হলেও রোগী আশ্বস্ত বোধ করেন না। এর ফল হলো আস্থার ঘাটতি, আর সেই আস্থার ঘাটতি শেষ পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রার ক্ষতিতে পরিণত হয়।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে কম খরচে, বাস্তবভিত্তিক, কমিউনিটিভিত্তিক মডেলের দিকে গুরুত্ব দিয়ে তাকাতে হবে। এমন একটি উদাহরণ হলো আমাদের গ্রাম ক্যানসার কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের উদ্যোগ, বিশেষ করে খুলনা শহরে অবস্থিত এর ব্রেস্ট সেন্টার। অক্টোবর ২০১০ থেকে মে ২০২৬ পর্যন্ত এই সেন্টারে ২৯ হাজার ৪৯৭ জন নারী স্তন-সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে সেবা নিয়েছেন। এখানে মাত্র ২ হাজার টাকায় স্তন সমস্যার মূল্যায়ন করা হয়েছে, যা বিভাগীয় শহর বা রাজধানীর অনেক সেবার তুলনায়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

এর অর্থনৈতিক তাৎপর্য গুরুত্বপূর্ণ। যদি এই নারীদের মাত্র ৫০ শতাংশও বিদেশে মূল্যায়নের জন্য যেতেন এবং প্রত্যেকে পরামর্শ, যাতায়াত, খাবার ও থাকার জন্য গড়ে মাত্র ১ হাজার মার্কিন ডলার ব্যয় করতেন, তাহলে সম্ভাব্য বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হতো প্রায় ১৪ দশমিক ৭৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। প্রতি ডলার প্রায় ১২২ টাকা হিসেবে এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৮০ কোটি টাকা। জনসমক্ষে আলোচনার ভাষায় এটি প্রায় ১৮০–১৮৩ কোটি টাকা সম্ভাব্য সাশ্রয় হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

এই হিসাব খুবই সংযত। বাস্তবে অনেক পরিবার বিদেশে চিকিৎসা নিতে গেলে ১ হাজার ডলারের অনেক বেশি ব্যয় করে। এর সঙ্গে আরও থাকে অদৃশ্য খরচ—কর্মদিবস নষ্ট হওয়া, পরিবারের মানসিক চাপ, বারবার যাতায়াত, এবং একই পরীক্ষা পুনরায় করার ব্যয়। তাই একটি আস্থাযোগ্য স্থানীয় মূল্যায়ন কেন্দ্র শুধু চিকিৎসা ব্যয় কমায় না; এটি পরিবারের সঞ্চয় এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রাও রক্ষা করে।

আমাদের গ্রাম মডেল আমাদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। প্রথমত, স্বাস্থ্যসেবা শুরু হতে হবে আস্থা দিয়ে। স্তন সমস্যা নিয়ে আসা একজন নারী প্রায়ই ভীত ও উদ্বিগ্ন থাকেন। তাঁর প্রয়োজন সময়, গোপনীয়তা, সম্মানজনক যোগাযোগ, সঠিক ইতিহাস গ্রহণ, ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় ডায়াগনস্টিক সহায়তা এবং পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা। কম খরচের সেবা মানে নিম্নমানের সেবা নয়। বরং এর অর্থ হলো শৃঙ্খলাবদ্ধ ব্যবস্থাপনা, সম্পদের যথাযথ ব্যবহার এবং জনকল্যাণের প্রতি প্রতিশ্রুতি।
দ্বিতীয়ত, এই মডেল দেখায় যে প্রাথমিক মূল্যায়ন বিকেন্দ্রীকরণ করা সম্ভব। প্রতিটি রোগীর ঢাকায় গিয়ে সেবা শুরু করার প্রয়োজন নেই। বিভাগীয় শহর, জেলা শহর এবং নির্বাচিত উপজেলা পর্যায়ের কেন্দ্রগুলোয় নির্ভরযোগ্য প্রথম মূল্যায়ন সম্ভব—যদি সেগুলো সঠিকভাবে সংগঠিত, তদারকিপ্রাপ্ত এবং রেফারেল ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকে। বাংলাদেশ স্তন স্বাস্থ্য, জরায়ুমুখ ক্যানসার, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি রোগ এবং অন্যান্য সাধারণ রোগের জন্য জাতীয় পর্যায়ে রোগভিত্তিক মূল্যায়নকেন্দ্রের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারে।

তৃতীয়ত, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষানির্ভরতা কমাতে হবে। ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, যখন তা চিকিৎসাগতভাবে প্রয়োজনীয়। কিন্তু পরীক্ষা চিকিৎসকের বিচারবোধকে সহায়তা করবে, তার বিকল্প হবে না। অনেক রোগী আস্থা হারান, যখন তাঁরা মনে করেন, চিকিৎসকের পরামর্শ শুধুই দীর্ঘ পরীক্ষার তালিকার একটি প্রবেশদ্বার। উন্নত ব্যবস্থায় থাকতে হবে মানসম্মত ক্লিনিক্যাল প্রটোকল, স্পষ্ট রেফারেল পদ্ধতি, ইলেকট্রনিক মেডিক্যাল রেকর্ড, পরীক্ষার যৌক্তিক ব্যবহার পর্যবেক্ষণ, এবং দেশের ভেতরেই দ্বিতীয় মতামত পাওয়ার ব্যবস্থা।

চতুর্থত, রোগীর সঙ্গে যোগাযোগকে চিকিৎসার মানের একটি মূল অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। সাধারণ সমস্যায় পাঁচ মিনিটের পরামর্শ যথেষ্ট হতে পারে, কিন্তু ক্যানসার-ভীত রোগী বা দ্বিতীয় মতামতপ্রার্থী রোগীর জন্য তা যথেষ্ট নয়। ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় কাউন্সেলিং, রোগী-নেভিগেশন, ফলোআপ কল এবং লিখিত ব্যাখ্যা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এগুলো বিলাসী সেবা নয়; এগুলো আস্থা গড়ে তোলার অপরিহার্য উপাদান।

সরকার ইতোমধ্যে ক্যানসার, কিডনি, হৃদ্‌রোগ ও অন্যান্য বিশেষায়িত সেবা শক্তিশালী করার কথা ভাবছে—এটি উৎসাহব্যঞ্জক। কিন্তু শুধু অবকাঠামো দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। নতুন হাসপাতাল, নতুন শয্যা এবং নতুন যন্ত্রপাতির সঙ্গে নতুন ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিও যুক্ত করতে হবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্য শুধু কতজন রোগী দেখা হলো, তা দিয়ে নয়, বরং অপেক্ষার সময়, রোগীকে ব্যাখ্যা দেওয়া, যৌক্তিক পরীক্ষা ব্যবহার, রেফারেল সম্পন্ন হওয়া, খরচের স্বচ্ছতা এবং রোগীর সন্তুষ্টি দিয়ে মূল্যায়ন করতে হবে।

বাংলাদেশ তিনটি স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে একটি ‘বিদেশমুখী চিকিৎসা নির্ভরতা কমানোর কৌশল’ গ্রহণ করতে পারে: আস্থাযোগ্য স্থানীয় মূল্যায়ন, সাশ্রয়ী বিশেষজ্ঞ রেফারেল এবং রোগী-নেভিগেশন। এই কৌশলের অধীনে সরকার সফল অলাভজনক ও কমিউনিটিভিত্তিক মডেল চিহ্নিত করতে পারে, তাদের ব্যয় কাঠামো বিশ্লেষণ করতে পারে এবং সরকারি-বেসরকারি ও সামাজিক খাতের অংশীদারত্বের মাধ্যমে তা বিস্তৃত করতে পারে। খুলনা ও রামপালে আমাদের গ্রামের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাকেন্দ্র হতে পারে।

এটি জাতীয় অর্থনীতির বিষয়ও। যে রোগী দেশে নির্ভরযোগ্য সেবা পান, তিনি বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করেন। যে পরিবার অপ্রয়োজনীয় বিদেশযাত্রা এড়াতে পারে, তারা পরিবারের সঞ্চয় রক্ষা করে। যে স্থানীয় কেন্দ্র মানুষের আস্থা অর্জন করে, তা ঢাকা ও বিদেশি হাসপাতালের ওপর চাপ কমায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, যে রোগী বাংলাদেশের ভেতরে সম্মানজনক সেবা পান, তিনি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি আস্থার একজন দূত হয়ে ওঠেন।

বাংলাদেশের কোনো বিদেশি মডেল অন্ধভাবে নকল করার প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশের নিজের শক্তিকে সংগঠিত করাই এখন জরুরি। আমাদের আছে চিকিৎসক, নার্স, প্রযুক্তিবিদ, কমিউনিটি কর্মী, ডিজিটাল টুলস এবং সামাজিক খাতের প্রতিষ্ঠান। প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থাপনা মডেল, যা রোগীকে কেন্দ্র করে এসব শক্তিকে একত্র করবে।

আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত নয় মানুষকে বিদেশে যেতে বাধা দেওয়া। রোগীর সব সময় নিজের নিরাপত্তা ও আস্থার জায়গায় সেবা নেওয়ার স্বাধীনতা থাকতে হবে। প্রকৃত লক্ষ্য হওয়া উচিত দেশের সেবাকে এতটাই আস্থাযোগ্য, সাশ্রয়ী ও সুসংগঠিত করা, যাতে প্রাথমিক মূল্যায়ন বা দ্বিতীয় মতামতের জন্য রোগী বাধ্য হয়ে বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন অনুভব না করেন।

আমাদের গ্রামের অভিজ্ঞতা দেখায়, এটি সম্ভব। একটি কম খরচের, কমিউনিটিভিত্তিক স্তন মূল্যায়ন সেবা ইতোমধ্যে হাজারো নারীকে স্থানীয়ভাবে সেবা নিতে সহায়তা করেছে। বাংলাদেশ যদি এমন মডেল সারা দেশে বিস্তৃত করতে পারে, তাহলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, পরিবারের দুর্ভোগ কমবে এবং জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা পুনর্গঠিত হবে।

এখন সময় এসেছে শুধু হাসপাতাল নির্মাণ নয়, স্বাস্থ্যব্যবস্থার পুনর্গঠন নিয়ে ভাবার। আস্থাও এক ধরনের অবকাঠামো। যোগাযোগও চিকিৎসার অংশ। ব্যবস্থাপনাও একধরনের ওষুধ। আর রোগীকেন্দ্রিক স্থানীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থা হতে পারে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বিনিয়োগ।

রেজা সেলিম: প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, আমাদের গ্রাম ক্যানসার কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, রামপাল, বাগেরহাট