বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো অ্যাম্বার জীবাশ্মের সন্ধান

কয়লার মধ্যে থাকা অ্যাম্বারছবি: সায়েন্স অ্যালার্ট

পাইন বা অন্য কোনো গাছের গা বেয়ে চুইয়ে পড়া সুগন্ধি আঠালো রস বা রজন দেখলে আমাদের চোখে ভেসে ওঠে এক আদিম বন্য পৃথিবীর ছবি। কোটি কোটি বছর ধরে এই আঠালো রসই মাটির নিচে জমে শক্ত হয়ে স্ফটিকের মতো রূপ নেয়, যাকে বলা হয় ‘অ্যাম্বার’। ডাইনোসরদের যুগে গাছের গা থেকে চুইয়ে পড়া এই আঠায় আটকে পড়া মশা, মাছি বা পিঁপড়ার জীবাশ্ম নিয়ে বিজ্ঞানীরা বহু রহস্যের সমাধান করেছেন। এবার পৃথিবীতে থাকা সবচেয়ে প্রাচীন অ্যাম্বারের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স অ্যাডভান্সেসে প্রকাশিত এক গবেষণা ফলাফলে বলা হয়েছে, চীনের সুদূর উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের একটি কয়লাখনি থেকে বিজ্ঞানীরা শত শত অতিক্ষুদ্র অ্যাম্বারের কণা আবিষ্কার করেছেন। এগুলো প্রায় ৩৮ কোটি ৫০ লাখ বছর আগের মিডল ডেভোনিয়ান যুগের। এই আবিষ্কার মহাকাশ ও পৃথিবীবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক বিশাল মাইলফলক। কারণ, এর আগে মানুষের জানা সবচেয়ে পুরোনো অ্যাম্বারের চেয়েও এটি প্রায় ৬ কোটি ৫০ লাখ বছর বেশি প্রাচীন! শুধু তা–ই নয়, পৃথিবীতে প্রথম ডাইনোসরদের আবির্ভাবের প্রায় ১৫ কোটি বছর আগের ইতিহাসের সাক্ষী এই অ্যাম্বার কণাগুলো।

চীনা একাডেমি অব সায়েন্সেসের জীবাশ্মবিদ এবং এই গবেষণার প্রধান লেখক বিজ্ঞানী চিহাং লুও বলেন, ‘এর আগে নিশ্চিত হওয়া সবচেয়ে প্রাচীন অ্যাম্বার পাওয়া গিয়েছিল লেট কার্বনিফেরাস যুগে, যা মূলত বীজ উৎপাদনকারী উদ্ভিদের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। কিন্তু আমাদের পাওয়া এই নতুন অ্যাম্বার এমন এক যুগের, যখন পৃথিবীতে বীজযুক্ত উদ্ভিদের জন্মই হয়নি। এর সহজ অর্থ হলো, পৃথিবীতে বীজ ছড়ানোর মতো উন্নত উদ্ভিদের বিবর্তন হওয়ার আগেই, সাধারণ কিছু সংবহনকলাযুক্ত বা নালিকা বান্ডিলসমৃদ্ধ উদ্ভিদ নিজেদের শরীরে অত্যন্ত জটিল রাসায়নিক যৌগসমৃদ্ধ রজন তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল।’

সাধারণত জুয়েলারির দোকানে বা জাদুঘরে আমরা লালচে-সোনালি রঙের যে চকচকে বড় বড় অ্যাম্বার রত্ন দেখি, এই প্রাচীন অ্যাম্বার কিন্তু তেমন ছিল না। বিজ্ঞানীরা উত্তর-পশ্চিম চীনের হুজিয়েরসাইট ফর্মেশন থেকে সংগৃহীত ১০ কেজি কয়লা পরীক্ষা করে ২৪১টি অতি ক্ষুদ্র অ্যাম্বারের টুকরা উদ্ধার করেছেন। এই টুকরাগুলো আকারে মাত্র ০.১ থেকে ১.৫ মিলিমিটার (১ ইঞ্চির ক্ষুদ্র একটি ভগ্নাংশ) চওড়া ছিল। এগুলো খালি চোখে দেখা প্রায় অসম্ভব। আর তাই কয়লার কালো পাথরের বুক থেকে এগুলোকে খুঁজে বের করতে বিজ্ঞানীরা অতিবেগুনি রশ্মি ব্যবহার করেন। অতিবেগুনি আলোর নিচে এই খুদে অ্যাম্বার কণাগুলো চমৎকার উজ্জ্বল দ্যুতি ছড়িয়ে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেয়।

বিজ্ঞানীরা প্রথমে দারুণ উত্তেজিত হলেও বেশ সতর্ক ছিলেন। একে সরাসরি অ্যাম্বার না বলে তাঁরা প্রথমে রজনসদৃশ জৈব উপাদান হিসেবে ধরে নেন। এরপর অপটিক্যাল টেস্ট, ইনফ্রারেড স্পেক্ট্রোস্কোপি এবং মাস স্পেক্ট্রোমেট্রির মতো একাধিক জটিল রাসায়নিক ও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাঁরা শতভাগ নিশ্চিত হন যে এই দানাগুলোর মধ্যে পাইন বা কনিফার জাতীয় গাছের আঠার সব রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান।

বিজ্ঞানীদের ধারণা, আদিম যুগে বনাঞ্চলে ঘন ঘন লাগা দাবানল এবং পরজীবী ছত্রাকের আক্রমণ থেকে নিজেদের ক্ষতস্থান নিরাময় করতে এবং আত্মরক্ষা করতেই উদ্ভিদেরা এই আঠালো কষ তৈরি করা শুরু করেছিল। এটি ছিল উদ্ভিদের বিবর্তনের এক অনন্য কৌশল। গভীর মূলতন্ত্র, কাঠ ও পাতার বিবর্তনের পাশাপাশি এই আঠা তৈরির ক্ষমতাই আদিম উদ্ভিদদের স্থলভাগে টিকে থাকতে ও ছড়িয়ে পড়তে সাহায্য করেছিল। এ বিষয়ে বিজ্ঞানী চিহাং লুও বলেন, ‘সেটি ছিল পৃথিবীর এক ঐতিহাসিক রূপান্তরের যুগ। তখন গাছগুলো ক্রমেই লম্বা হচ্ছিল, কাঠে রূপ নিচ্ছিল এবং তাদের গভীর মূল কাঠামো বা মহাদেশের মাটিকে বদলে দিচ্ছিল। এই পুঁচকে অ্যাম্বার কণা সেই মহা পরিবেশগত পরিবর্তনের সময়েই তৈরি হয়েছিল।’

সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট