বিড়াল কেন এত আদুরে
বিড়ালের চোখের মায়াবী চাহনি আর অদ্ভুত সব আচরণ যুগের পর যুগ মানুষকে মুগ্ধ করছে। অনেকে মনে করেন বিড়াল কেবল স্বার্থের টানে মানুষের কাছে থাকে। তবে বিজ্ঞানীরা বিড়ালের মনস্তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করে চমৎকার কিছু তথ্য পেয়েছেন। তাঁদের দাবি, এই আদুরে প্রাণীদের প্রতিটি অভ্যাসের পেছনে নির্দিষ্ট কিছু বৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে।
যুক্তরাজ্যের পোর্টসমাউথ এবং সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, বিড়ালের সঙ্গে বন্ধুত্ব করার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো চোখ ছোট বা সরু করা। এই বিশেষ পদ্ধতিটি বিড়ালের হাসিকে অনুকরণ করে। একে বিজ্ঞানের ভাষায় স্লো ব্লিংক বা চোখের পাতা ধীরে বন্ধ করা বলা হয়। এটি মানুষ এবং বিড়ালের মধ্যে গভীর বন্ধন তৈরি করতে সাহায্য করে। এ বিষয়ে ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্সের স্কুল অব সাইকোলজির অধ্যাপক কারেন ম্যাককম্ব বলেন, আপনার বিড়ালের দিকে তাকিয়ে চোখ দুটো এমনভাবে সরু করুন যেমনটা আপনি কোনো মৃদু হাসির সময়ে করেন। এরপর কয়েক সেকেন্ডের জন্য চোখ দুটো বন্ধ রাখুন। আপনি দেখতে পাবেন, তারাও আপনার জবাবে ঠিক একইভাবে চোখের পাতা নাড়ছে। এভাবেই আপনি ওদের সঙ্গে একধরনের কথোপকথন শুরু করতে পারেন। মানুষ চোখের পাতা ধীরে বন্ধ করলে বিড়ালও একইভাবে সাড়া দেয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ১০টি পোষা বিড়ালের মধ্যে অন্তত একটি বিড়াল একাকিত্বের সমস্যায় ভোগে। মালিকের কাছ থেকে সাময়িকভাবে দূরে থাকলে এদের মধ্যে একধরনের মানসিক চাপ বা আচরণগত সমস্যা তৈরি হয়। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, যেসব পরিবারে কোনো নারী সদস্য নেই অথবা একাধিক নারী বাস করেন, সেখানকার বিড়ালদের মধ্যে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। বাড়িতে খেলার খেলনা না থাকা এবং অন্য কোনো পোষা প্রাণী না থাকলেও বিড়ালরা একা বোধ করে।
অনেকে মনে করেন বিড়াল মানুষকে কেবল খাবার দেওয়ার একটি যন্ত্র মনে করে। বিজ্ঞান এই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে। চীন পাওয়া ৫ হাজার ৩০০ বছর আগের বিড়ালের হাড় পরীক্ষা করে দেখা গেছে, তারা প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের শস্যভান্ডারকে ইঁদুরের হাত থেকে রক্ষা করত। মানুষ তাদের আশ্রয় দিত আর তারা মানুষের উপকার করত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিড়াল মানুষের পরিবারের অংশ হয়ে উঠেছে। কুকুরের মতো বিড়ালের মধ্যেও মানুষের প্রতি একধরনের নিরাপদ সংযুক্তির বৈশিষ্ট্য রয়েছে। মানুষের উপস্থিতি এদের শান্ত ও নিরাপদ রাখে। আদর পাওয়ার পর বিড়ালের মস্তিষ্কে বিশেষ হরমোন নিঃসৃত হয়, যা মানুষের ভালোবাসার অনুভূতির মতোই।
বিড়াল মানুষের চেয়ে অনেক বেশি সংবেদনশীল। তারা বায়ুমণ্ডলের চাপের পরিবর্তন, গন্ধ এবং সূক্ষ্ম শব্দ মানুষের আগেই টের পেয়ে যায়। ঝড় আসার ঠিক আগে বায়ুমণ্ডলের চাপ হঠাৎ কমে যায়। বিড়ালের ভেতরের কান এই পরিবর্তন সহজেই ধরতে পারে। এ ছাড়া তারা দূরের মেঘের ডাক শুনতে পায় এবং বজ্রপাতের ফলে বাতাসে তৈরি হওয়া ওজন গ্যাসের ধাতব গন্ধও শুকতে পারে।
একটি বিড়াল দিনে প্রায় ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত ঘুমাতে পারে। তারা একা থাকতে পছন্দ করে এবং ঘুমানোর জন্য নিরাপদ জায়গা খোঁজে। বিড়াল মানুষের চেয়ে প্রায় ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি তাপমাত্রা পছন্দ করে। ঘরের মেঝে ঠান্ডা হলে তারা একটু উষ্ণতার জন্য জুতার বাক্সের মতো ছোট জায়গায় কুঁকড়ে শুয়ে থাকে।
বিড়ালের মুখের দুই পাশে প্রায় ২৪টি করে নমনীয় গোঁফ বা চুল থাকে। এ ছাড়া চোখের ওপরে, চিবুকে এবং সামনের পায়ের পেছনেও এমন সূক্ষ্ম গোঁফ থাকে। এই চুলগুলোর গোড়ায় গভীর স্নায়ু যুক্ত থাকে, যা অন্ধকার রাতেও বিড়ালকে শিকারের পথ চিনতে সাহায্য করে। এই গোঁফ বাতাসের প্রবাহ এবং শিকারের দূরত্ব নিখুঁতভাবে পরিমাপ করতে পারে। এর সাহায্যেই বিড়াল অত্যন্ত নিখুঁত ও চমৎকারভাবে শিকার করে থাকে।
সূত্র: বিবিসি সায়েন্স ফোকাস