পৃথিবীকে ঠান্ডা করার বিতর্কিত প্রস্তাব

বিমানের প্রতীকী ছবিউইকিমিডিয়া কমনস

মানুষ তার নিজের তৈরি প্রযুক্তির ক্ষতি থেকে বাঁচতে যখন প্রকৃতির ওপর কৃত্রিম নিয়ন্ত্রণ চালাতে যায়, তখন জন্ম নেয় নতুন কোনো বিপদ। বৈশ্বিক উষ্ণতা কমানোর এক মহাজাগতিক পরিকল্পনা করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা তেমনই এক অনাকাঙ্ক্ষিত সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন। আকাশকে ঠান্ডা করার বৈজ্ঞানিক চেষ্টা এবার সাধারণ মানুষের বিমান ভ্রমণকে বিষাক্ত করে তোলার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

কয়েক বছর ধরেই পৃথিবীকে ঠান্ডা করার একটি বিতর্কিত প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে বিজ্ঞানীদের মধ্যে। এই পরিকল্পনায় বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে সালফার স্প্রে করার কথা বলা হয়েছে। তবে নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, এই কৌশলের কারণে বিমান চলাচলে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে। বিমান যখন জলবায়ু ঠান্ডা করার রাসায়নিক ছিটানো এলাকার ওপর দিয়ে উড়ে যাবে, তখন যাত্রী এবং ক্রু সদস্যরা উচ্চ মাত্রার সালফিউরিক অ্যাসিডের সংস্পর্শে আসতে পারেন। এই গবেষণাটি সৌর জিও–ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে একটি নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা কমাতে সূর্যালোকের একটি অংশ মহাকাশে প্রতিফলিত করে ফিরিয়ে দেওয়ার আইডিয়া এটি। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই প্রযুক্তির বড় আকারের প্রয়োগ এখনো অনেক দূরে। তবে পরিবেশগত বিতর্কের পাশাপাশি এখন বিমান সুরক্ষার বিষয়টিও নীতিনির্ধারকদের ভাবনায় রাখতে হবে।

সৌর জিও–ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অন্যতম আলোচিত রূপ হলো স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারিক অ্যারোসল ইনজেকশন। এই পদ্ধতিতে বায়ুমণ্ডলের উঁচুতে সালফার ডাই–অক্সাইড গ্যাস ছেড়ে দেওয়া হয়। এই গ্যাস পরে সালফেট অ্যারোসল তৈরি করে সূর্যালোক প্রতিফলিত করে। এটি ঠিক আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের পর পৃথিবী সাময়িক ঠান্ডা হওয়ার প্রক্রিয়ার মতো কাজ করে। পূর্বের হিসাব অনুযায়ী, মেরু অঞ্চলের বায়ুমণ্ডলে বার্ষিক প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টন সালফার ডাই–অক্সাইড ইনজেক্ট করলে পৃথিবীর তাপমাত্রা প্রায় ০.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমানো সম্ভব। বাণিজ্যিক বিমানগুলো ক্রান্তীয় অঞ্চলের স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছাতে পারে না। তাই বিজ্ঞানীরা বিকল্প পথ খুঁজছিলেন। সুমেরু এবং কুমেরু অঞ্চলে স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার স্তরটি অনেক নিচে থাকে। সংশোধিত বিশেষ বিমান ব্যবহার করে ওই সব অঞ্চলে অ্যারোসল মুক্ত করার সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা চলছে।

মেরু অঞ্চলে সালফার ছিটানো সহজ হলেও এর পরের পরিস্থিতি নিয়ে অনুসন্ধান চালিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের রাটগার্স ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা। তাঁরা দেখতে চেয়েছেন যাত্রীবাহী বিমান পরে ওই এলাকা দিয়ে উড়ে গেলে কী ঘটবে। আধুনিক বিমানগুলো ইঞ্জিনের কম্প্রেসরের মাধ্যমে বাইরের বাতাস টেনে নেয়। এই বাতাস পরে বিমানের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে কেবিনে সরবরাহ করা হয়। রাটগার্স ইউনিভার্সিটির গবেষণায় দেখা গেছে, বিমান ওড়ার সময় বাইরের ওই সালফেট কণা আবার সালফিউরিক অ্যাসিডে রূপান্তরিত হতে পারে। এর ফলে অল্প পরিমাণ অ্যাসিড কেবিনের ভেতরের বাতাসে প্রবেশ করার পথ পেয়ে যায়। অধিকাংশ ফ্লাইটে এই অ্যাসিডের ঘনত্ব কম থাকবে। তবে নির্দিষ্ট কিছু বায়ুমণ্ডলীয় অবস্থায় কেবিনে সালফিউরিক অ্যাসিডের মাত্রা প্রতি ঘনমিটারে ৫০ মাইক্রোগ্রাম ছাড়িয়ে যেতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পেশাগত এক্সপোজার নির্দেশিকা অনুযায়ী এই মাত্রা স্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক। উত্তর আমেরিকার সঙ্গে এশিয়া বা ইউরোপের সংযোগকারী মেরু রুটের বিমানগুলো এই ঝুঁকিতে বেশি পড়বে।

সালফারের উপাদানগুলো মানুষের শ্বাসতন্ত্রের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেছে, এই অ্যাসিডের সংস্পর্শে এলে শ্বাসনালিতে প্রদাহ তৈরি হতে পারে। এটি অ্যাজমা অ্যাটাক বা হাঁপানির সমস্যাকে ট্রিগার করে। যাদের আগে থেকে শ্বাসকষ্ট আছে, তাদের সমস্যা আরও বাড়িয়ে দেয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি বা বারবার এই অ্যাসিডের সংস্পর্শে এলে হৃদ্‌রোগের জটিলতা বৃদ্ধি পায়। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বেন পাইলট এবং কেবিন ক্রুরা। তাঁরা নিয়মিত ওই প্রভাবিত আকাশপথ দিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা করেন।

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া