জাহাজের কারণে সমুদ্রে প্লাস্টিক বাড়ছে
কয়েক দশক ধরেই ভয়ানকভাবে প্লাস্টিক দূষণের মুখে পড়ছে পৃথিবী। আর তাই স্থলভাগের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন সাগর ও মহাসাগরে লাখ লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য ভেসে বেড়াচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব বর্জ্য বিভিন্ন উপায়ে পরিষ্কারের চেষ্টা করা হলেও সুফল মিলছে কম।
প্লাস্টিক দানা বা পেলিয়েট হলো মাত্র ২ থেকে ৫ মিলিমিটার ব্যাসের ক্ষুদ্র কণা। এগুলো মূলত কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যা দিয়ে পরবর্তী সময় বিভিন্ন প্লাস্টিক পণ্য তৈরি করা হয়। সমস্যা হলো, এগুলো অত্যন্ত হালকা ও পিচ্ছিল হওয়ায় সংরক্ষণ বা জাহাজে তোলার সময় খুব সহজেই ছড়িয়ে পড়ে। একবার এগুলো পানিতে মিশলে পরিষ্কার করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এগুলো বালু বা শেওলার সঙ্গে এমনভাবে মিশে যায় যে বছরের পর বছর সমুদ্রের স্রোতে ভাসতে থাকে।
প্লাস্টিক দানার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় সামুদ্রিক প্রাণীদের। মাছ, কচ্ছপ এবং বিশেষ করে সামুদ্রিক পাখিরা এই দানাগুলোকে খাবার ভেবে গিলে ফেলে। এ বিষয়ে বিজ্ঞানী জেনিফার ল্যাভার্স বলেন, বর্তমানে সমুদ্রে যে পরিমাণ প্লাস্টিক দানা মিশছে, তা লাখ লাখ তরুণ সামুদ্রিক পাখির ‘খাবার’ হওয়ার জন্য যথেষ্ট। কিছু অঞ্চলে আমরা দেখছি, ১০০ শতাংশ প্রাণীর দেহেই প্লাস্টিক পাওয়া যাচ্ছে। এই দানাগুলো প্রাণীদের পরিপাকতন্ত্র বন্ধ করে দেয়, যার ফলে তারা পুষ্টিহীনতায় ভোগে এবং শেষ পর্যন্ত মারা যায়। এসব দানা কেবল প্লাস্টিকের টুকরা নয়। এসব বিষাক্ত রাসায়নিকের বাহক হিসেবেও কাজ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্লাস্টিক দানা সমুদ্রের পানি থেকে অন্যান্য ক্ষতিকারক বিষাক্ত পদার্থ শোষণ করে নেয়। পরে যখন কোনো ক্ষুদ্র প্রাণী এই দানা খায়, তখন সেই বিষক্রিয়া খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে বড় শিকারি প্রাণীদের দেহেও পৌঁছে যায়।
২০২১ সালে শ্রীলঙ্কা উপকূলে এক্স–প্রেস পার্ল জাহাজে দুর্ঘটনার ফলে বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক ও প্লাস্টিক দানা সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়ে। এতে প্রায় ৬৪০ কোটি ডলারের পরিবেশগত ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। শ্রীলঙ্কার সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল জাস্টিসের চেয়ারম্যান হেমান্থ উইথানেজ বলেন, শ্রীলঙ্কায় এই প্রভাব ছিল তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘস্থায়ী। প্লাস্টিক দানা ক্ষতিকারক নয়, এমন যুক্তি দেওয়ার আর কোনো অবকাশ নেই।
আন্তর্জাতিক কনভেনশন মারপোল অনুযায়ী সমুদ্রে ইচ্ছাকৃতভাবে প্লাস্টিক ফেলা নিষিদ্ধ। কিন্তু দুর্ঘটনাবশত দানা ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে কঠোর কোনো নিয়ম নেই। আর তাই গবেষকেরা দাবি করছেন, প্লাস্টিক দানাকে একটি নির্দিষ্ট ইউএন নম্বর দেওয়া হোক, যাতে এর প্যাকেজিং, লেবেলিং ও পরিবহনে সর্বোচ্চ সতর্কতা নিশ্চিত করা যায়। এ বিষয়ে বিজ্ঞানী থেরেসা কার্লসন বলেন, প্লাস্টিক তৈরিতে হাজার হাজার রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়, যার মধ্যে অনেকগুলো পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। সমুদ্রকে এই বিষাক্ত প্লাস্টিক দানার হাত থেকে বাঁচাতে বিশ্বব্যাপী কঠোর আইন প্রণয়নের এটাই উপযুক্ত সময়।
সূত্র: আর্থ ডটকম