খাবারে পরজীবীর আক্রমণ বাড়ছে

প্যাকেটজাত লেটুস এই পরজীবী ছড়ানোর সম্ভাব্য মাধ্যম হতে পারেফাইল ছবি: রয়টার্স

পৃথিবীতে খালি চোখে দেখা যায় না, এমন এক ক্ষুদ্র অণুজীবের জগৎ রয়েছে। আমাদের অজান্তেই এই অণুজীবগুলো খাবারের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে নানা রকম রোগ সৃষ্টি করে। সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে এমনই কিছু মারাত্মক পরজীবী বা প্যারাসাইটের আক্রমণ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এটি মানুষের স্বাস্থ্য ও দৈনন্দিন জীবনের জন্য এক বড় রহস্যময় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে সাইক্লোস্পোরা নামের একটি পরজীবীর প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। মিশিগান অঙ্গরাজ্যের স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্যাকেটজাত লেটুস ও সালাদের পাতা এই পরজীবী ছড়ানোর সম্ভাব্য মাধ্যম হতে পারে। এই পরজীবী মূলত মল দ্বারা দূষিত খাবার ও পানির মাধ্যমে ছড়ায়। যদিও এই নির্দিষ্ট খাদ্যের উৎসটি এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। প্রাদুর্ভাবের পেছনে অন্য কোনো খাবারও দায়ী থাকতে পারে। কর্তৃপক্ষ এখনো নির্দিষ্ট কোনো চাষি বা সরবরাহকারীর নাম প্রকাশ করেনি।

পাকস্থলী বিশেষজ্ঞ ভিনসেন্ট হো অস্ট্রেলিয়ায় ই–কোলি প্রাদুর্ভাবের সময় উল্লেখ করেছিলেন, অনেক প্যাকেটজাত সালাদ পণ্যের গায়ে লেখা থাকে সব ধোয়া ও খাওয়ার জন্য প্রস্তুত। তারপরও এগুলো আবার ধুয়ে নেওয়া উচিত। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে চলমান সাইক্লোস্পোরা প্রাদুর্ভাবের মধ্যে বিশেষজ্ঞরা সাধারণ মানুষকে কাঁচা শাকসবজি খাওয়ার বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন। তাজা শাকসবজি ভালোভাবে পরিষ্কার করার তাগিদও দিয়েছেন তাঁরা।

মহামারি বিশেষজ্ঞ মারিসা ডনেলি তাঁর একটি সাম্প্রতিক ব্লগ বার্তায় জানিয়েছেন, ‘মুদিদোকান ও রেস্তোরাঁগুলোতে প্যাকেটজাত ও বাক্সবন্দী সালাদ এড়িয়ে চলা অব্যাহত রাখুন। আরও তথ্য না আসা পর্যন্ত আমি এমন সব ফলমূল বা সবজি বেছে নিচ্ছি, যা খোসা ছাড়ানো যায় অথবা যেগুলোর উপরিভাগ মসৃণ হয়, যেমন শসা।’

বর্তমানে সাইক্লোস্পোরা অন্যতম প্রধান খাদ্যবাহী পরজীবী হলেও খাবার তৈরি ও নাড়াচাড়া করার সময় আরও অনেক ক্ষতিকারক পরজীবী এড়িয়ে চলার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। দ্য ল্যানসেট সাময়িকীতে প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) একটি নতুন প্রতিবেদনে ২০২১ সালে খাদ্যবাহী পরজীবীর ক্ষতিকর প্রভাবের তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। তালিকায় বিশ্বজুড়ে মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ফিতাকৃমি বা টেনিয়া সোলিয়াম। এটি সাধারণত মানুষ যখন কাঁচা বা আধা সেদ্ধ শূকরের মাংস খায়, তখন শরীরে প্রবেশ করে। ফিতাকৃমির এই সিস্টগুলো ক্ষুদ্রান্ত্রে গিয়ে পূর্ণাঙ্গ কৃমিতে পরিণত হয়। তবে আক্রান্ত মানুষের মল দ্বারা দূষিত শাকসবজি খাওয়ার মাধ্যমেও এটি ছড়াতে পারে। সবজি ও মাংস খুব ভালোভাবে রান্না করে এই পরজীবী সহজেই এড়িয়ে চলা যায়। মাংসের ক্ষেত্রে একে মাইনাস ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পাঁচ দিন ধরে ফ্রিজে জমিয়ে রাখলে এই ঝুঁকি কমে।

তালিকায় পরের অবস্থানে রয়েছে ক্লোনোরকিস সাইনেনসিস। এই ফ্লুক বা চ্যাপটা কৃমিটি মাছ খায়, এমন স্তন্যপায়ী প্রাণী ও মানুষকে সংক্রমিত করে। এটি এশিয়া ও রাশিয়ায় সবচেয়ে বেশি দেখা যায় এবং এর বেশির ভাগ সংক্রমণ ঘটে চীনে। মানুষ যখন এই কৃমির লার্ভাযুক্ত কাঁচা বা আধা সেদ্ধ মাছ খায়, তখন এটি মানবদেহে প্রবেশ করে। এরপরের অবস্থানে রয়েছে টক্সোপ্লাজমা গন্ডি। এটি মানুষকে আক্রমণকারী সাধারণ প্রোটোজোয়ান পরজীবী। এই পরজীবীতে আক্রান্ত অনেক মানুষের শরীরে কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। ফলে তাঁরা জানতেই পারেন না যে তাঁরা সংক্রমিত হয়েছেন। তবে গর্ভবতী নারী ও যাঁদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম, যেমন এইচআইভি এইডস আক্রান্ত ব্যক্তি বা যাঁরা অঙ্গ প্রতিস্থাপন করেছেন, তাঁদের জন্য এটি মারাত্মক সমস্যা তৈরি করতে পারে। এটি মূলত বিড়ালের মলের সংস্পর্শ থেকে ছড়ায়। এর বিস্তার রোধ করতে বিড়ালকে সবজির বাগান থেকে দূরে রাখতে হবে। বিড়ালের মল অপসারণের সময় সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। কারণ, এটি কম্পোস্ট সারে ব্যবহার করা যাবে না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে উল্লেখিত অন্যান্য পরজীবীর মধ্যে রয়েছে ক্রিপ্টোস্পোরিডিয়াম প্রজাতি, যা গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল ও শ্বাসতন্ত্রের অসুস্থতা তৈরি করে; লিভার ফ্লুক বা ফ্যাসিওলা প্রজাতি; ট্রিপ্যানোসোমা ক্রুজি ও ক্ষুদ্রান্ত্রের গোলকৃমি বা অ্যাসকারিস প্রজাতি। আক্রান্ত মানুষের বর্জ্য ও সম্ভাব্য দূষিত পানির সংস্পর্শ এড়িয়ে চললে এই পরজীবীগুলোর বেশির ভাগই প্রতিরোধ করা সম্ভব।

সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট