প্রতিষেধকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে জিন পরিবর্তন করছে ম্যালেরিয়ার পরজীবী

মশার কামড় থেকে ম্যালেরিয়া রোগ হয়ফাইল ছবি: রয়টার্স

অণুজীবের দ্রুত রূপ বদলানোর ক্ষমতা তাদের বেঁচে থাকার লড়াইয়ে বেশ এগিয়ে রাখে। প্রকৃতিতে টিকে থাকার এই বিবর্তনীয় লড়াই বেশ পুরোনো। যখনই কোনো প্রতিষেধক তৈরি করা হয়, পরজীবীরাও দ্রুত নিজেদের ঢাল তৈরি করে নেয়। মানবদেহে প্রাণঘাতী ম্যালেরিয়া সৃষ্টিকারী অণুজীবের ক্ষেত্রে ওষুধ প্রতিরোধের ক্ষমতা দিন দিন অবিশ্বাস্য রকম জটিল হয়ে উঠছে। ম্যালেরিয়ার সবচেয়ে বিপজ্জনক পরজীবী প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিপেরাম। সাম্প্রতিক এক জিনগত গবেষণায় দেখা গেছে, এই পরজীবী বিভিন্ন প্রতিষেধকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে একের পর এক জিন পরিবর্তন করছে।

ইথিওপিয়ার আরমাওয়ার হ্যানসেন রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অলেমায়হু লেটেবো, যুক্তরাজ্যের লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের লিন এন ভ্যানহির এবং তাঁদের সহকর্মীরা নতুন এই গবেষণা পরিচালনা করেছেন। গবেষণাপত্রটি বিখ্যাত 'নেচার মাইক্রোবায়োলজি' সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকদের মতে, পুরোনো ও পরিত্যক্ত ওষুধের বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া প্রতিরোধ ক্ষমতা টিকে থাকার পাশাপাশি বর্তমানে ব্যবহৃত মূল ওষুধগুলোর বিরুদ্ধেও পরজীবীদের প্রতিরোধক্ষমতা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।

ম্যালেরিয়া বিশ্বের অন্যতম প্রাণঘাতী সংক্রামক ব্যাধি। প্রতিবছর কোটি কোটি মানুষ এতে আক্রান্ত হন। মারা যায় লাখ লাখ মানুষ, যাদের বেশির ভাগই আফ্রিকার পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। এই রোগ নিরাময়যোগ্য হলেও গবেষকদের প্রতিনিয়ত নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। কারণ, গত ৭০ বছরে উদ্ভাবিত প্রায় সব ম্যালেরিয়ার ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিপেরাম। ১৯৭০–এর দশকে আবিষ্কৃত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ম্যালেরিয়া ওষুধ আর্টেমিসিনিনের ক্ষেত্রেও আংশিক প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তুলেছে তারা।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ১৫ বছর আগে আর্টেমিসিনিন প্রতিরোধী পরজীবীর দেখা মিলেছিল। এখন আফ্রিকার বিভিন্ন স্থানেও এর উপস্থিতি শনাক্ত হচ্ছে। তবে এই প্রতিরোধ ক্ষমতা রাতারাতি তৈরি হয় না। কোনো ওষুধ ব্যবহার বন্ধ করে দিলেও এর বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া প্রতিরোধ জিন থেকে হঠাৎ উধাও হয়ে যায় না। এর সঙ্গে বহু জিনগত পরিবর্তন জড়িয়ে থাকে। কিছু পরিবর্তন চলমান ওষুধের মোকাবিলায় নতুন করে তৈরি হয়। আবার কিছু পরিবর্তন পুরোনো বা পরিত্যক্ত হয়ে যাওয়া ওষুধের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের স্মারক হিসেবে পরজীবীর দেহে থেকে যায়।

ইথিওপিয়ার চিত্র বেশ জটিল। ফ্যালসিপেরামের চিকিৎসায় ক্লোরোকুইন ওষুধের কার্যকারিতা অনেক আগেই শেষ হয়েছে। এখন প্রথম সারির চিকিৎসা হিসেবে আর্টেমেথার ও লুমেফ্যান্ট্রিন নামের দুটি উপাদানের মিশ্রণ ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে ম্যালেরিয়া কেবল একধরনের পরজীবীর কারণে হয় না। প্লাজমোডিয়াম ভিভাক্স নামের আরেকটি পরজীবীও ম্যালেরিয়া ছড়ায়। এটি অপেক্ষাকৃত কম প্রাণঘাতী এবং ক্লোরোকুইন দিয়েই এর নিরাময় সম্ভব। ভৌগোলিকভাবে দুটি পরজীবী একই এলাকায় অবস্থান করে।

গবেষকেরা জানিয়েছেন, একই অঞ্চলে দুই ভিন্ন পরজীবীর ওপর আলাদা ওষুধের চাপ ফ্যালসিপেরামের বিবর্তনে কেমন প্রভাব ফেলছে। ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ইথিওপিয়ার ১৫টি জেলা থেকে ৬০৫টি প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিপেরামের নমুনা সংগ্রহ করে গবেষণাগারে জিন বিশ্লেষণ করা হয়। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, বহু বছর আগে চিকিৎসায় নিষিদ্ধ করা সত্ত্বেও ক্লোরোকুইন প্রতিরোধী জিন ৬১ দশমিক ২ শতাংশ নমুনায় বহাল তবিয়তে টিকে রয়েছে।

গবেষকদের ধারণা, একই এলাকায় থাকা অন্য পরজীবী ভিভাক্সের চিকিৎসায় এখনো ক্লোরোকুইন ব্যবহার করা হচ্ছে। এই কারণে ফ্যালসিপেরামের জিনেও ক্লোরোকুইন প্রতিরোধক্ষমতা থেকে গেছে। ২০০৫ সাল থেকে ইথিওপিয়ায় ব্যবহার বন্ধ থাকা ‘সালফাডক্সিন-পিরিমেথামিন’ ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী জিনের উপস্থিতিও দেখা গেছে ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ নমুনায়। একই সঙ্গে বর্তমান চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধের বিরুদ্ধেও পরজীবীর রুখে দাঁড়ানোর তথ্য মিলেছে। গবেষণায় ব্যবহৃত নমুনার ১০ শতাংশ ক্ষেত্রে আর্টেমিসিনিনের বিরুদ্ধে আংশিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা মার্কার বা জিন শনাক্ত হয়েছে। একটি নির্দিষ্ট এলাকায় আর্টেমিসিনিন প্রতিরোধী জিনের হার ছিল সর্বোচ্চ ৪৮ দশমিক ৬ শতাংশ। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, একাধিক ওষুধ প্রতিরোধী জিন একসঙ্গে পরজীবীর শরীরে অবস্থান করছে। ক্লোরোকুইন প্রতিরোধী মার্কার থাকা পরজীবীদের মধ্যে আর্টেমিসিনিন প্রতিরোধ গড়ে তোলার সম্ভাবনা অন্তত ৩ গুণ বেশি দেখা গেছে।

এ ছাড়া বর্তমানে ব্যবহৃত লুমেফ্যান্ট্রিন ওষুধের প্রতি সংবেদনশীলতা কমে যাওয়ার লক্ষণ মিলেছে ৯৩ শতাংশ নমুনায়। এর অর্থ হলো, ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে ইথিওপিয়া কোনো একটি নির্দিষ্ট সমস্যায় ভুগছে না। একেক এলাকার পরজীবী একেক ধরনের পরিবর্তন বা মিউটেশন নিয়ে বিবর্তিত হচ্ছে। তাই ম্যালেরিয়া নির্মূলে সব জায়গায় একই কৌশল প্রয়োগ করলে কাজ হবে না।

গবেষকেরা তাঁদের গবেষণাপত্রে উল্লেখ করেছেন, ইথিওপিয়ায় ফ্যালসিপেরামের আঞ্চলিক রূপান্তর ও ভৌগোলিক পার্থক্যের কারণে অঞ্চলভিত্তিক প্রতিরোধ কৌশল নেওয়া জরুরি। ফ্যালসিপেরাম ও ভিভাক্স দুটো পরজীবীর ওপরই নজর রাখতে হবে। জিনগত বিন্যাস পর্যবেক্ষণ এবং চিকিৎসাপদ্ধতির প্রতিনিয়ত মূল্যায়নই পারে এই বিবর্তন মোকাবিলায় সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে।

সূত্র: সায়েন্সঅ্যালার্ট