সৌরজগতের শেষ প্রান্ত কতটা উত্তপ্ত
সৌরজগৎ বলতে আমরা অনেকেই শুধু সূর্য ও তার চারপাশে ঘূর্ণমান আটটি গ্রহের সমষ্টিকে বুঝি। তবে সৌরজগৎ মূলত গ্রহ, উপগ্রহ, বামন গ্রহ, গ্রহাণু, ধূমকেতু ও আন্তগ্রহ ধূলিকণার এক বিশাল পরিবার। সৌরজগতের শেষ প্রান্তে বা বাইরে থাকা গ্রহ পর্যবেক্ষণ করতে ১৯৭৭ সালে ভয়েজার ১ ও ভয়েজার ২ নামের দুটি মহাকাশযান পাঠিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। দীর্ঘ প্রায় পাঁচ দশকের যাত্রায় নাসার পাঠানো মহাকাশযান দুটি সৌরজগতের সীমানা অতিক্রম করার সময় প্রচণ্ড উত্তপ্ত আগুনের দেয়ালের মুখোমুখি হয়েছিল। নাসার তথ্যমতে, সেখানকার তাপমাত্রা ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার কেলভিন বা প্রায় ৫৪ হাজার থেকে ৯০ হাজার ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত।
সৌরজগতের শেষ সীমানা কোথায়, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। কেউ ওর্ট ক্লাউড বা সূর্যের মহাকর্ষীয় প্রভাব যেখানে শেষ হয়েছে, তাকেই সীমানা ধরেন। তবে মহাকাশবিজ্ঞানীদের অনেকেই হেলিওপজকে সীমানা বলে মনে করেন। সূর্য থেকে নিয়মিত চার্জযুক্ত কণার প্রবাহ সৌরবায়ু প্রবাহিত হয়। এই সৌরবায়ু সব গ্রহকে ছাড়িয়ে প্লুটোর দূরত্বের প্রায় তিন গুণ পথ অতিক্রম করে সূর্যের চারপাশে হেলিওস্ফিয়ার নামের একটি বিশাল বুদ্বুদ তৈরি করেছে। এই হেলিওস্ফিয়ারের শেষ সীমানাকেই বলা হয় হেলিওপজ।
নাসার তথ্যমতে, যেখানে সৌরবায়ু ও আন্তনাক্ষত্রিক বায়ুর চাপ একে অপরের সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করে, সেখানেই হেলিওপজ অবস্থিত। মহাকাশে এগিয়ে চলার সময় হেলিওস্ফিয়ার অনেকটা সাগরে চলন্ত জাহাজের মতো একটি ধাক্কার অনুভূতি দেয়। ২০১২ সালের ২৫ আগস্ট ভয়েজার ১ প্রথম মহাকাশযান হিসেবে হেলিওস্ফিয়ার ছাড়িয়ে এই রহস্যময় হেলিওপজ অতিক্রম করে। এরপর ২০১৮ সালে ভয়েজার ২ যানটিও একই পথ অনুসরণ করে।
হেলিওপজ অতিক্রম করার সময় মহাকাশযান দুটি ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার কেলভিন তাপমাত্রার সম্মুখীন হয়। আর তাই স্থানটিকে অনেক সময় আগুনের দেয়াল হিসেবে অভিহিত করা হয়। প্রশ্ন উঠতে পারে, এত প্রচণ্ড তাপমাত্রায় মহাকাশযান গলে যায়নি না কেন? বিজ্ঞানীরা জানান, সেখানে যদিও কণার শক্তি বা তাপমাত্রা অনেক বেশি, কিন্তু কণাগুলো মহাকাশে অত্যন্ত পাতলা বা ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকে। ফলে মহাকাশযানের বডির সঙ্গে কণাগুলোর সংঘর্ষের সম্ভাবনা অনেক কম থাকে। মহাকাশ যানে পর্যাপ্ত পরিমাণ তাপ পরিবাহিত হয় না।
ভয়েজার ১ ও ২ যানের বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা আরও কিছু চমকপ্রদ তথ্য পেয়েছেন। ভয়েজার ২ নিশ্চিত করেছে, হেলিওপজের ঠিক বাইরের চৌম্বকক্ষেত্র হেলিওস্ফিয়ারের ভেতরের চৌম্বকক্ষেত্রের সমান্তরালে অবস্থিত। ভয়েজার ১ যানের পাওয়া তথ্যের সঙ্গে এই মিল বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করেছে। প্রথমে মনে করা হয়েছিল, এটি একটি কাকতালীয় ঘটনা।
সূত্র: আইএফএল সায়েন্স