মহাকাশে ভবঘুরে গ্রহের সন্ধান পেলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা

দলছুট এক গ্রহের খোঁজ পেয়েছেন বিজ্ঞানীরাছবি: জে স্কোরন, কে উলাস্কি/ওজিএলই

মহাবিশ্বের বিশালতায় এমন অনেক গ্রহ রয়েছে, যারা কোনো নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘোরে না। মহাকাশবিজ্ঞানের ভাষায় এদের বলা হয় রোগ প্ল্যানেট বা ভবঘুরে গ্রহ। সম্প্রতি জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এমনই এক নিঃসঙ্গ গ্রহের সন্ধান পেয়েছেন। এর ভর আমাদের সৌরজগতের দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্রহ শনির প্রায় সমান। ভূমি ও মহাকাশ উভয় স্থানের শক্তিশালী টেলিস্কোপ ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা গ্রহটির আকার ও পৃথিবী থেকে এর দূরত্ব পরিমাপ করতে সক্ষম হয়েছেন।

সাধারণত বেশির ভাগ গ্রহ এক বা একাধিক নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘোরে। কিছু গ্রহ কোনো মহাকর্ষীয় বন্ধন ছাড়াই মহাকাশে মুক্তভাবে ঘুরে বেড়ায়। এদের কোনো অভিভাবক নক্ষত্র নেই। যেহেতু এসব গ্রহ নিজে থেকে কোনো আলো ছড়ায় না, তাই এদের সরাসরি দেখা অসম্ভব। এদের খুঁজে বের করার জন্য জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মাইক্রোলেন্সিং নামক একটি বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করেন। মাইক্রোলেন্সিং পদ্ধতিতে যখন একটি অন্ধকার গ্রহ দূরবর্তী কোনো নক্ষত্রের সামনে দিয়ে যায়, তখন গ্রহটির মহাকর্ষীয় বল একটি লেন্সের মতো কাজ করে পেছনের নক্ষত্রটির আলোকে বাঁকিয়ে ও উজ্জ্বল করে দেয়। এই আলোর পরিবর্তন দেখেই বিজ্ঞানীরা গ্রহটির উপস্থিতি নিশ্চিত করেন। কেবল পৃথিবী থেকে এই পর্যবেক্ষণ চালালে গ্রহটির সঠিক ভর বা দূরত্ব নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়ে অনেক সময়।

চীনের পিকিং ইউনিভার্সিটি ও চীনের ন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অবজারভেটরিজের বিজ্ঞানী সুভো ডংয়ের নেতৃত্বে একটি দল এই গ্রহ আবিষ্কার করেছে। দলটি একটি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত মাইক্রোলেন্সিং ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে। তারা একই ঘটনা পৃথিবী ও মহাকাশের ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান থেকে পর্যবেক্ষণ করেছে। গবেষক দলটি পৃথিবী থেকে ৯ লাখ ৩০ হাজার মাইল দূরে অবস্থিত গাইয়া স্পেস টেলিস্কোপের তথ্যের পাশাপাশি ভূমিতে থাকা একাধিক জরিপ কেন্দ্রের তথ্য বিশ্লেষণ করেছে। বিভিন্ন স্থানে আলো পৌঁছানোর সময়ের সামান্য পার্থক্য তুলনা করে তারা অত্যন্ত নির্ভুলভাবে গ্রহটির ভর ও দূরত্ব বের করেছে। বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, এই ভবঘুরে গ্রহটি বৃহস্পতির ভরের প্রায় ২২ শতাংশ। অনেকটা আমাদের শনি গ্রহের ভরের সঙ্গে বেশ সামঞ্জস্যপূর্ণ। গ্রহটি মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্র থেকে প্রায় ৯ হাজার ৭০০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত।

জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, এ ধরনের কম ভরের মুক্ত গ্রহ সম্ভবত কোনো একটি সৌরজগতের ভেতরেই জন্ম নিয়েছিল। তাঁরা ধারণা করছেন, কোনো একসময় এটি তার নিজের নক্ষত্রকে কেন্দ্র করেই ঘুরছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে প্রতিবেশী কোনো বড় গ্রহের মহাকর্ষীয় প্রভাব বা নক্ষত্রের অস্থিতিশীলতার কারণে এটি তার কক্ষপথ থেকে ছিটকে বেরিয়ে পড়ে। পরে মহাকাশে চিরদিনের জন্য নিঃসঙ্গ হয়ে যায়। এ আবিষ্কারটি আমাদের ছায়াপথে লুকিয়ে থাকা কোটি কোটি ভবঘুরে গ্রহের বিবর্তন ও তাদের উৎস বুঝতে বিজ্ঞানীদের সাহায্য করবে।

সূত্র: স্পেস ডটকম